
অনলাইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গুগল ইমেজ সার্চ, পিন্টারেস্ট থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনেও দেখা মিলছে এসব ছবির। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এআই দিয়ে তৈরি ছবি এখন এতটাই বাস্তবসম্মত হয়ে উঠেছে যে, অনেক সময় আসল ছবি ও কৃত্রিম ছবির মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এআই দিয়ে তৈরি নিম্নমানের বা অতিরিক্ত কনটেন্টের বিস্তারকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয় হয়েছে ‘এআই স্লপ’ শব্দটিও। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইনে দেখা কোনো ছবির সত্যতা যাচাই করা জরুরি হয়ে উঠেছে। তবে কিছু লক্ষণ খেয়াল করলে সহজেই সন্দেহজনক ছবি শনাক্ত করার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
এআই দিয়ে তৈরি ছবি চেনার ৬টি লক্ষণ জেনে নেওয়া যাক—
১. লেখায় অস্বাভাবিকতা
এআই-তৈরি ছবি শনাক্ত করার অন্যতম সহজ উপায় হলো ছবির ভেতরে থাকা লেখা পরীক্ষা করা। পোস্টার, বইয়ের প্রচ্ছদ, সাইনবোর্ড, টি-শার্ট কিংবা বিজ্ঞাপনে লেখা বিকৃত, অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ বা অর্থহীন হলে ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। আধুনিক এআই মডেল লেখার ক্ষেত্রে উন্নতি করলেও ছবির ছোট ছোট অংশে ভুল থেকে যেতে পারে। তাই সন্দেহজনক ছবির লেখা জুম করে দেখা উচিত।
২. হাত ও শরীরের গঠনে অসংগতি
মানুষের হাত ও আঙুলের গঠন এআই-তৈরি ছবিতে প্রায়ই অস্বাভাবিক দেখা যায়। অতিরিক্ত আঙুল, জোড়া লেগে থাকা আঙুল, বিকৃত নখ কিংবা অস্বাভাবিক গাঁট চোখে পড়লে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া কবজি, কনুই, ঘাড়, পা ও শরীরের অনুপাতও খেয়াল করতে হবে। চোখ, নাক ও দাঁতের গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকলেও ছবিটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
৩. অতিরিক্ত নিখুঁত চেহারা
এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে অনেক সময় মানুষের ত্বক অস্বাভাবিক মসৃণ, চোখ অতিরিক্ত উজ্জ্বল, চুল নিখুঁতভাবে সাজানো কিংবা দাঁত অস্বাভাবিকভাবে সমান দেখা যায়। প্রথম দেখায় এসব ছবি আকর্ষণীয় মনে হলেও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কৃত্রিমতার আভাস পাওয়া যেতে পারে। তবে শুধু নিখুঁত চেহারা দেখেই কোনো ছবিকে এআই-তৈরি বলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
৪. অস্বাভাবিকভাবে নিখুঁত বস্তু ও পরিবেশ
খাবার, পণ্য কিংবা বিজ্ঞাপনের ছবিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। এসব ছবিতে খাবারের গঠন, রং, আলো ও সাজসজ্জা কখনো কখনো অস্বাভাবিক নিখুঁত দেখায়। বাস্তব দৃশ্যের স্বাভাবিক দাগ, অসম্পূর্ণতা কিংবা আলো-ছায়ার বৈচিত্র্য অনুপস্থিত থাকলে ছবিটি ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত। তবে পেশাদার ফটোগ্রাফিতেও এ ধরনের নিখুঁত দৃশ্য দেখা যেতে পারে।
৫. আলো, ছায়া ও প্রতিফলনে অসংগতি
ছবির পেছনের দৃশ্য, ছায়া ও প্রতিফলনেও এআইয়ের ভুল ধরা পড়তে পারে। যেমন, আলোর উৎসের সঙ্গে ছায়ার দিক না মেলা, আয়নায় প্রতিফলন অস্বাভাবিক হওয়া কিংবা পটভূমির কোনো বস্তু বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়া। ছবিতে অতিরিক্ত জটিল বা অস্বাভাবিক নকশা থাকলেও সেটি সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
৬. সূক্ষ্ম বিবরণ অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া
এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবিতে কখনো কখনো সূক্ষ্ম বিবরণ অস্পষ্ট হয়ে যায়। ভবনের ইটের গাঁথুনি, গাছের পাতার স্বাভাবিক গঠন কিংবা পোশাকের নকশা ভালোভাবে ফুটে না উঠলে ছবিটি পরীক্ষা করা উচিত। পুরোনো ছবি রঙিন করা বা ছবির মান উন্নত করার সময়ও এ ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। ফলে ছবি আঁকা বা কৃত্রিমভাবে তৈরি বলে মনে হতে পারে।
ছবি যাচাইয়ে কাজে আসতে পারে যেসব টুল
শুধু চোখের পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর না করে প্রযুক্তিগত টুল ব্যবহার করেও ছবির উৎস ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ‘সার্কেল টু সার্চ’ এবং গুগল লেন্সের ‘অ্যাবাউট দিস ইমেজ’ ফিচারের মাধ্যমে ছবিটি কোথায় প্রকাশিত হয়েছে বা এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য তথ্য খুঁজে দেখা যায়।
এ ছাড়া গুগলের জেমিনি অ্যাপে ছবি আপলোড করে সেটি বিশ্লেষণ করতে বলা যেতে পারে। গুগলের ‘SynthID’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি কিছু ছবির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট যাচাই-সুবিধাও সহায়ক হতে পারে। তবে এসব টুলের ফলাফলকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এআই ইমেজ ডিটেক্টর কি শতভাগ নির্ভরযোগ্য?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে তৈরি ছবি শনাক্ত করার কোনো পদ্ধতিই সব ক্ষেত্রে শতভাগ নির্ভুল নয়। কখনো এআই-তৈরি ছবিকে বাস্তব ছবি হিসেবে শনাক্ত করা হতে পারে, আবার বাস্তব ছবিকেও ভুলভাবে কৃত্রিম বলে চিহ্নিত করা হতে পারে।
তাই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ছবি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু ডিটেক্টরের ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে ছবির মূল উৎস, প্রকাশের সময়, প্রেক্ষাপট এবং দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে সংবাদ, ব্যক্তি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছবি প্রকাশের আগে মূল উৎস যাচাই করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
আরটিভি/এসকে


