
শব্দখেলায় কবি মনসুর আজিজ দক্ষকারিগর। জীবনবোধের আশ্চর্য অনুভূতি ছন্দবদ্ধ নির্মাণে কবিতার বাবুই পাখি মনসুর আজিজ। আলঙ্কারিক সাজসজ্জায় সাজানো গোছানো শিল্প-নির্মাণে কবি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাহিত্যজীবনের পরম প্রত্যয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। আধুনিক সভ্যতার প্রাত্যহিক জীবনাচারকে সঙ্গ করে প্রাকৃতিক নানান রঙ মিশ্রণে ঐতিহ্যের আবহমানকে হৃদয়ে ধারণ করে তিনি কবিতার কারুকাজ সাজাতে পছন্দ করেন।
নদীর মতো কবিতার আছে শাখা-প্রশাখা। গঠন-প্রক্রিয়ায় আছে নানান শৈলী। কবিতাকে বলা হয় সব শিল্পের শিখর। তাই কবিতা সকল শিল্পের জননী। কবিতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় শিল্পের নানান শাখা। কবিতা তাই কঠিনতর শিল্প। কেবল শব্দের জোড়া দিলেই কবিতা শিল্প হয় না। কেবল অন্ত্যমিল দিলেই কবিতা বলা যায় না। শিল্প যেহেতু সাধনার বিষয়; কবিতাও সাধনার পরিশুদ্ধ ব্যবস্থাপনা। কাব্যকলার অনেক বিষয় আছে যেগুলো আয়ত্ব করতে হয়, আত্মস্ত করতে হয়, অনুশীলন করতে হয়। ব্যাপক অধ্যবসায় ও নিরলস সাধনা করে প্রকৃত কবি কবিতায় মগ্ন হন। বিস্তর প্রস্তুতি নিয়ে কবি যখন কবিতায় আত্মমগ্ন হন কবিতা তখন প্রাণ পায়। শিল্পের মতো সৌন্দর্য-সুধায় আত্মপ্রকাশ করে। মানুষের মনে আনন্দের মধুর ঢেউ তুলে। নচেত কবিতা নিরর্থক হয়ে ওঠে। কবি মনসুর আজিজ এক্ষেত্রে কতটা সার্থক ও প্রাসঙ্গিক হতে পেরেছেন তার একটা পর্যবেক্ষণ জরুরি।
কবি মনসুর আজিজ কবিতার পোকা। কবিতার এক্সপেরিমেন্ট করেন। আইন তৈরি করেন আবার আইন ভাঙ্গেন। ভাঙা গড়ার খেলায় তিনি আনন্দ পান। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত এবং মুক্তবৃত্ত ছন্দে লেখা কবিতার উদাহরণ আছে তার লেখায়। ছন্দখেলায় তিনি মগ্ন থাকেন। কবিতার আড়ষ্টতা তিনি মোটেই পছন্দ করেন না। গতিপ্রবাহ তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি মেঘনাপাড়ের মানুষ। মেঘনার যে ঢেউ কবির রিদমে উতাল পাতাল করে তারই ছন্দদোলা কবিতায় প্রতিষ্ঠা করেন। নদীর গতিপ্রবাহ কবিতার প্রবাহধারায় তিনি একীভূত করতে পেরেছেন। তাই তার কবিতা সজীব। দুর্বোধ্য-অভিব্যক্তি থেকে কবি মুক্ত। তার কবিতার শব্দচেতনা মৌলিক। বাকশৈলী নিরন্তর অর্থদ্যোতক। উপমানির্ভরতা তার কবিতাকে চিত্রকল্পের মোড়কে সচিত্র-সুন্দরে রূপান্তর করে।
বহুমাত্রিক লেখক মনসুর আজিজ। ছড়া. কবিতা. উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ-গবেষণা এবং অনুবাদ সাহিত্য। প্রতিটি ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। সাহিত্যের প্রতি তার কমিটমেন্ট অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জীবনের নানান ছড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সাহিত্যে টিকে থাকা যেখানে অসম্ভব সেখানে তিনি সাহিত্যের নানান শাখায় বাজপাখির মতো উড়ে বেড়াচ্ছেন তা সত্যিই বিষ্ময়কর। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঁচিশ। এর মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ, ছড়া-কিশোরকবিতা, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, গবেষণা, অনুবাদ ও কিশোর সাহিত্য। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হলো— অতলান্ত নীলচোখ (২০০২), অনন্ত আকাশের জ্যোতির্ময় নক্ষত্র (২০০৭), মনুষ্যত্বের ল্যাম্পপোস্ট (২০০৯), শব্দের বেনারসি (২০১১), জোড়াপাখি ফলের রুমাল (২০১২), জল ও জোয়ারের কাব্য (২০১৪), আঁধারের নাকফুল (২০১৬), সুনির্বাচিত কবিতা (২০১৭), আত্মধ্যানের আসন (২০২০), নিমগ্ন সন্ধ্যার আলো (২০২৩) এবং করতলে বৃক্ষের দাগ (২০২৫)।
শিশুতোষ সাহিত্যেও তিনি রেখে গেছেন সমান স্বাক্ষর। নীল গালিচার স্বপ্ন (২০০৭), হৃদয়পুরের রাজা (২০০৮), মেঘের খোপায় পালক ভরে (২০০৯), নতুন ভোরে হীরের কুচি (২০১১), সবুজ পাতা আঁকতে জানি (২০১৪), দুর্দিনের ছড়া (২০০৯)-সবগুলোই পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। কিশোর উপন্যাস ভেলায় চড়ে সারাবেলা (২০০৮), গল্পগ্রন্থ রাজকুমারী (২০১৪) ও নির্বাচিত কিশোর গল্প (২০১৮), উপন্যাস জীবনবেলার বিকিকিনি (২০১৩) এবং গবেষণা শিশুর আচরণ শিশুর সাথে আচরণ (২০১৫, ২০২৩ দ্বিতীয় সংস্করণ) তার সাহিত্যকীর্তিকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। অনুবাদগ্রন্থ লৌহদাবন (মূল: টেড হিউজ, ২০২৫) ইতোমধ্যে পাঠকমহলে আলোড়ন তুলেছে।
সৃজনশীলতার অপরিমেয় ক্ষেত্র কবি ইতোমধ্যে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। নানান ছন্দের পরিচর্যায় তার কবিতা পূর্ণতা পেলেও এখানে সেসব-বিষয়ে আলোকপাত করার সুযোগ নেই। তার সৃষ্টিকর্ম নিয়ে ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে। কিন্তুবিস্তারিত আলোচনা সময়-সাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে কবি মনসুর আজিজের অষ্টাদশী কবিতার আঙ্গিক নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। সনেট কী, সনেট কাকে বলে কিংবা সনেটের গোড়ার কথা, অথবা সনেটের বিস্তারিত ইতিহাস আলোচনা করাও এখানে মূখ্য নয়। আলোচনার স্বার্থে সনেটের অবকাঠামো জানাটা জরুরি। বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে সনেট নিয়ে হাজির হয়েছেন তারও আগে বিশ্বসাহিত্যে সনেটের চর্চা ছিল খুবই জনপ্রিয়। মধুসূদন-উত্তর বাংলা সাহিত্যে সনেটের একটা আলাদা মর্যাদা লাভ করে। তবে সবার পক্ষে সনেট রচনা করা সম্ভব ছিল না। কেননা সনেট একটি নির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসরণ করে লিখতে হয়। ছন্দের জ্ঞান না থাকলে সনেট রচনা যেমন অসম্ভব তেমনি সনেট বিশ্লেষণ ও দ্ব্যর্থক-মর্মার্থ অনুধাবনও অসম্ভব। তাই সনেট অতিশয় অনুশীলন ও পরিচর্যার বিষয়। কবি মনসুর আজিজ সেই সনেটের আকার-প্রকার বিশ্লেষণ করে তিনি নিজস্ব একটি কাঠামো তৈরি করেছেন তা হলো অষ্টাদশী (সনেট) কবিতা।
‘সনেট দিঘিতে’ কবিতাটির প্রতি মনোযোগ দিলে কবি মনসুর আজিজের অষ্টাদশী কবিতা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। কবি জীবনের উঠোনে হেলেঞ্চা শাক খোঁজার মতো শব্দ সংগ্রহ করেন। সেই সুচারু শব্দ দিয়ে নির্মাণ করেন কবিতার মাচান। সংগৃহীত শাক দিয়ে রঙিন শিকায় যত্নে রাখা উজ্জ্বল মাছ রান্না হবে। রান্নার ঘ্রাণে মৌ মৌ করবে সমস্ত ঘর। সারাঘরে ছন্দিত একটা কাঁপন উঠবে।
‘হেলেঞ্চা শাকের মতো শব্দ তুলি জীবন উঠোনে
শব্দের সুচারু কাজে গড়ে তুলি কবিতা মাচান
রঙিন শিকায় দেখি উজ্জ্বল মাছেরা এক কোণে
ঘরময় সাঁতরায়ে তুলে যায় ছন্দের কাঁপন
মনপাখি ডেকে বলে মাছগুলো বড়ই আপন।’
(সনেট দিঘিতে: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
মাছ আর শাকের ব্যঞ্জনে রান্নাকৃত সুস্বাদু তরকারি। হেলেঞ্চা শাক, জীবন উঠোন, রঙিন শিখায়, উজ্জ্বল মাছ ইত্যাদি কবিতার উপকরণ। এসব উপকরণ দিয়ে তৈরি হবে কবিতার মাচান। নির্মিত হবে চমৎকার একটা ঘর। ঘরে থাকা নানান উপকরণের মাঝে একটা ছন্দিত সম্পর্ক থাকবে। একে অপরের সাথে আপন সম্পর্কের মতো গভীর মেলবন্ধন তৈরি হবে। এভাবে কবি মনসুর আজিজ তার অষ্টাদশী কবিতার আদর্শ বয়ান করেন।
‘হেলেঞ্চা শাকের মতো শব্দ তুলি’— হেলেঞ্চা শাক মূলত জলজতৃণ। দেশের খালবিল, নদনদী, পুকুর-ডোবায় এসব পাওয়া যায়। নিরেট প্রাকৃতিক। অন্যদিকে ‘মাছগুলো বড়ই আপন’— মাছের প্রসঙ্গ এনেছেন কবি। মাছও জলজ। কবি মনসুর আজিজের মনভূমি জল-জীবনের সাথে আশৈশব জড়িত। প্রাকৃতিক পেলবতায় কবির হৃদয় জুড়ে বসবাস করে গ্রামীণ-সংস্কৃতি। তারই আবহে কবি তার অষ্টাদশীর শরীর সাজাবেন বলে দৃঢ়-প্রতীজ্ঞা প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় স্তবকে তারই সত্যতা পাওয়া যায়। যেমন—
‘আউল বাতাস দেখি খাগবনে পাখনা ছড়ায়
সুঠাম নারীর হাতে লেগে যায় লোদের পায়েশ
হাঁসের ছানার ছোঁয়া খাল পেয়ে হৃদয় জুড়ায়
মাচা জুড়ে বেয়ে ওঠে শিম লাউ কিংবা রায়েশ
নতুন মাছের ঝোলে চাষি পায় তৃপ্তি ও আয়েশ।’
(সনেট দিঘিতে: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
আউল বাতাস, খাগবন, লোদের পায়েশ, হাঁসের ছানা, শিম-লাউ ইত্যাদি শব্দগুলো প্রকৃতির অতি ঘনিষ্ঠ রসায়ন। কবি শহরে যাপিত জীবনের সঙ্গী হলেও মন পড়ে থাকে রাখালিয়া বাঁশির সুর গ্রামীণ গৃহস্থালী জীবন-ক্যানভাসে। তাই তো কবির মানসে লেগে আছে নতুন মাছের ঝোলের স্বাদ। প্রকৃতির এইসব লীলাকে বুকের গহীনে লালন করে পৃথিবীকে সবুজের সংবাদ দিতে চান। শিল্পের নির্মেদ আঙ্গিকে গড়ে তুলতে চান শিল্পসৌধ। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে ছুঁয়ে দেখতে চান অষ্টাদশীর অপ্সরা শরীর। কবির সামনে থাকা বয়োজ্যেষ্ঠ বিশ্বসাহিত্যিক সেক্সপিয়ার, পণ্ডিত পেত্রার্ক, দেশীয় সাহিত্যে সনেটজনক মাইকেল মধুসূদন ও জীবনানন্দ দাশের সনেটকে পাশ কাটিয়ে নতুন এক সম্ভাবনা নিয়ে গ্রহণ করলেন চ্যালেঞ্জিং এক দূরহ-পথ। সমাজে নতুনধারার প্রচলন করা খুবই কঠিন। নতুনত্বে একটা বিরাট ভয় থাকে। কণ্টাকীর্ণ এই পথ। এ-পথে চলতে হলে রক্তাক্ত হতে হয়। নানান সমালোচনা সহ্য করতে হয়। সমালোচিত না হলে বাংলা সাহিত্যে জন্ম নিতেন না মাইকেল, জন্ম হতো জীবনানন্দের। কষ্টের বহু-কাহিনী আছে তাদের সাহিত্য জীবনে। নতুন মানেই তো সংস্কার। সনেট-সংস্কারে কবি মনসুর আজিজ বেছে নিলেন সেই কণ্টক-কঠিন পথ। অষ্টাদশীর শরীরে মসৃণ-লাবণ্যতর সুন্দর সাজ দিলেও ‘অষ্টাদশী’র সাজ কেমন হয়েছে সমালোচনার দৃষ্টিতে তা খুঁটে খুঁটে দেখার অধিকার রাখে।
‘সেক্সপিয়ারের জলে এই মাছ কাটে না সাঁতার
পেত্রার্কের নদীতেও কখনো দেখি না ডুব দিতে
মাইকেল ও দাশের সাগর নয় এর আধার
পোয়াতি ধানের খাঁজে কবিতার থোড় পেড়ে নিতে
চরের উগল মাটি প্রাণ পায় নতুন সঙ্গীতে।’
(সনেট দিঘিতে: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
কল্লোল যুগে পঞ্চকবির ‘রবি-বিদ্রোহ’ বাংলা কবিতাকে নতুন দিশা দিয়েছে। রাবিন্দ্রীক-কাব্যধারাকে পাশ কাটিয়ে তিরিশের দশকে প্রতিশ্রুতিশীল কবিগোষ্ঠী নবযুগের সূচনা না করলে হয়তো বাংলা কবিতা আরও অনেক পশ্চাতে পড়ে থাকতো। তাদের কালজয়ী সিদ্ধান্তে বাংলা কবিতা যেন আড়মোড়া দিয়ে জাগতে পেরেছে। আঙ্গিক ও চেতনা জুড়ে নতুন কাব্যভাষা নিয়ে ডালপালা মেলে বিরাট মহীরূহের রূপ ধারণ করতে পেরেছে। ছন্দের নানান অবকাঠামোতে কবিতা আশ্রয় নিতে পেরেছে। বোধ-অবোধের মাঝে চেতনা-প্রসূত মুক্তভাবনার মানসভূমি রচনা করতে পেরেছে। কবি মনসুর আজিজের অষ্টাদশী নদীতে এমন একটা ‘মাছ’ ছেড়েছেন যে মাছটা কখনও সেক্সপিয়ারের জলে সাঁতার কাটেনি। পেত্রার্কের নদীতেও কখনও ডুব-সাঁতার কিংবা জলকেলী করতে কেউ দেখেনি। মধুনদীতে না এমনকি দাশ-সাগরেও সে মাছ আশ্রয় নেয়নি। এমন একটি মাছ যে কেবল মনসুর আজিজের ব্যক্তিগত নদীতে সাঁতার কাটবে। কবি মনসুর আজিজ এক্ষেত্রে পরাবাস্তবতাকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে। সনেটজাতীয় কবিতায় পরাবাস্তবতার গুণ যুক্ত করে হলে কবিতা আরও বেশি উচ্চমার্গীয় হতে বাধ্য। কবি মনসুর আজিজ সেই উচ্চমার্গীয় ধারায় কবিতাকে উচ্চাসনে নিয়ে গেছেন।
‘শিকা থেকে মাছগুলো ছেড়ে দেই সনেট দিঘিতে
এ মাছের রঙরূপে বিমোহিত হবে কি না কেউ
কান পেতে আনমনা হবে কি না নতুন সঙ্গীতে।’
(সনেট দিঘিতে: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘১৪০০ সাল’ কবিতাটি পাঠ করলে রবি ঠাকুরের একটা তৃষ্ণা পাঠকমনে উঁকি দেয়। ‘কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি, কৌতুহল ভরে? এতবিরাট কবি আর এত বড় হাহাকার! সাধারণ পাঠক হিশেবে আমাদের অবাক করে দেওয়ার মতো কবি রবীন্দ্রনাথের এই আকুতি। যিনি বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন তুলতে পেরেছেন, পাঠকহৃদয়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি এই কবিতা লিখে সত্যিই আমাদের অবাক করে দিয়েছেন। কবি মনসুর আজিজও তার ‘ সনেট দিঘিতে’ তেমনি ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছেন। কবিমাত্রই পাঠসংশয়ে থাকেন। ‘এ মাছের রঙরূপে বিমোহিত হবে কি না কেউ / কান পেতে আনমনা হবে কি না নতুন সঙ্গীতে।’ কবি মনসুর আজিজ অষ্টাদশী নদীতে দেহসৌষ্ঠবে সনেটের যে অবকাঠামো তৈরি করেছেন পাঠক মহলে তা সাড়া জাগাতে পারবে কিনা রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। ‘নতুন সঙ্গীত’ রচনা করে পাঠককে বিমোহিত করতে চান। পাঠক বিমোহিত হবে কিনা কবির প্রশ্ন ভাবীকালের জন্য থাকুক।
‘সনেট’ বাংলা কবিতার জনপ্রিয় শাখা। বাংলা কবিতার ছান্দসিক নানান শাখার মধ্যে সনেট গাম্ভীর্য ও নীতিমান্য। বিশ্বসাহিত্যেও এই ছন্দের ব্যবহার ব্যাপক। মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতার মধ্য বাংলা সাহিত্যে এ-ছন্দের বিপুল জনপ্রিয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সনেট রচনা করেছেন। প্রায় সকল কবির হাতে সনেট রচিত হলেও সনেটের জনক মাইকেল মধুসূদন। তাকে কেন্দ্র করেই সনেটকলার নানা নিরীক্ষা হয়েছে। সকলেই পয়ারছন্দকে বাহন হিশেবে নিলেও অন্তানুপ্রাসে রয়েছে ভিন্নতা। পেত্রার্ক ও সেক্সপিয়রের ধারাকে নানাকায়দায় নতুনভাবে সাজাবার চেষ্টা করেছেন। মাইকেল মধুসূদন তার রচিত সনেটকে বলেছেন চতুর্দশপদী কবিতা।
কবিতার একটি জনপ্রিয় ছন্দকলা ও বিশেষ ছন্দে নির্মিত কাব্যকলার নাম সনেট। একটি মাত্র ভাবলীলা বা কল্পনানুভূতি যখন চৌদ্দ অক্ষর (কখনো আঠারো) সমন্বিত চতুর্দশ পংক্তিতে একটি বিশেষ ছন্দরীতি কাব্যিক প্রকাশ ঘটে, তখন-ই-তাকে সনেট বলা হয়।
ইটালিয়ান কবি পেত্রার্ক (১৩০৪-১৩৭৪) কাব্যপিতা। ইংরেজ কবি টমাস উইয়াট (১৫০৩-১৫৪২) পেত্রার্কের অষ্টক রীতি ঠিক রেখে ষষ্ঠকের মিল বিন্যাসে কিছুটা পরিবর্তন করে ইউটিয়ান রীতি প্রচলিত হয়।
বাংলা কাব্য সাহিত্যের মধ্যযুগের শেষভাগে। দেবেন্দ্রসেন (১৮৫৫-১৯১০) জয়দবে। কাশীরাম দাস প্রমুখ কবিগন উইটিয়ান ফর্মে সনেট রচনা করলেও তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পরেননি। উইটিয়ান ফর্মকে ইংরেজ কবি ওয়ার্সওয়ার্থ আরো পরিবর্তন করে ৫০০ সনেট রচনা করেন। কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ার সনেটের ফর্মকে আরো পরিবর্তন করে শেক্সপিয়ারিয়ান রীতি প্রবর্তন করেন। তবে সনেটের দুটি ধারা পেত্রার্কীয়ান এবং শ্রেক্সপিয়ারিয়ান রীতি খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
পেত্রার্কীয়ান সনেট রীতি হল দুটি। যেমন—
১. কখখক : কখখক :: গঘ গঘ গঘ
২. কখখক : কখখক :: গঘ গঘ : ঙঙ
উইটিয়ান সনেটরীতিও দুটি :
১. কখখক : কখখক :: গ ঘঘ গ :: ঙঙ
২. কখখক : কখখক :: গঘগঘ : ঙঙ
উইলিয়াম শেক্সপিয়ার আরো নিরীক্ষা করেন
কখকখ : গঘগঘ : ঙচ ঙচ : ছছ
বাংলা সাহিত্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত সনেট কে জনপ্রিয় করে তুলেন। তিনি বাংলা সনেটের সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন; -ক
তা তবে (অবোধ আমি।) অবহেলা করি, - খ
পরধন লোভে মত্ত, কবিনু ভ্রমণ - ক
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি। খ
কাটাইনু বহুদিন সুখ পরিহরি । -খ
অনিদ্রায়, নিরাহারে সপি কায় মন- ক
মজনু বিফল তবে অবরন্যে বরি;- খ
কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল -কানন-ক
স্বপ্নে তব কুললহ্মী কয়ে দিলা পরে, -গ
ওরে বাছা মাতৃ-কোষে রতনের রাজি, - ঘ
এ ভিখারী দশা তবে কেন তোর আজি ?- ঘ
যা ফিরি অঙ্গন তুই যারে ফিরি ঘরে - গ
পালিলাম আজ্ঞা সুখে পাইলাম কালে- য
মাতৃ-ভাষা রূপখনি, পূর্ণ মনিজালে। ঙ
তাই বলা যায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের সনেট রীতি হল :
কখখক : খকখক :: গঘঘঘ : ঙঙ
মধুসূদন দত্তের পর প্রথম চৌধুরী মোহিতলাল মজুমদার নবীন চন্দ্র, হেমচন্দ্র, জীবনানন্দ দাস, ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ সহ অনেক কবির রচনা শৈলিতে সনেট চর্চা হয়েছে। গঠন-আঙ্গিকেও অনেক রুপ পরিবর্তন হলেও সনেট ফর্ম থেকে কেউ বেরিয়ে আসেননি। চৌদ্দ পংক্তি ঠিক রেখে প্রতি চরণে মাত্রা বাজিয়েছেন। চৌদ্দ থেকে ১৮,২২,২৬,২৮ মাত্রা পর্যন্ত কেউ কেউ এগিয়ে গেছেন। অন্ত্যমিলের ও পরিবর্তন হয়েছে। কবি মনসুর আজিজ আঠারো চরণের আঠারো মাত্রায় তার অষ্টাদশী কবিতা সাজিয়েছেন। এ-ক্ষেত্রে কবি দারুণ উদ্বেলিত। দারুণ একটা স্বপ্ন নিয়ে তিনি নিরসলস চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। অষ্টাদশী কবিতা নিয়ে কবি খুবই আশাবাদী। নিরন্তর কবি কঠিনতর এই শিল্পকে অতি আপন করে নিয়েছেন।
কবি মনসুর আজিজ অষ্টাদশী সনেট লিখতে গিয়ে পূর্বসূরী কোনও কবিকে অনুসরণ না করে নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছেন। তার কবিতার গঠনপ্রণালি পর্যালোচনা করলে তার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যাবে। তিনি তার সনেটকে চার পঙক্তিতে আঠারো চরণে সাজিয়েছেন। প্রতিটি চরণে আঠারো মাত্রা মর্যাদা দিয়েছেন। ব্যতিক্রমী এই ধারা বাংলা কাব্যকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। নতুন একটি ধারা সংযোজন হলো। অক্ষরবৃত্তের মিত্রাক্ষর ছন্দে তার এই ব্যতিক্রমী ধারাকে সজীব করে তুলেছেন। প্রতিটি চরণকে তিনি ৮+১০ মাত্রার দুটি পর্বে বিন্যাস করেছেন। চার পঙক্তির প্রথম তিনটি পঙক্তিকে পাঁচ চরণ এবং শেষ পঙক্তিতে তিনটি চরণে বিন্যস্ত করেছেন। অন্ত্যমিলের ব্যাপারটিও খুবই তাৎপর্যময়। নানান স্টাইলের কবি চর্চার পাশাপাশি কবি সচেতনভাবে অষ্টাদশী কবিতাকে গভীর মমতায় লালন করেছেন।
চোখের মণিতে জ্বলে/ সারারাত নিয়নের আলো/ ৮+১০
চাঁদ গিলে খায় রাহু/আঁধারে জাবর শুধু কাটে/ ৮+১০
খিজির খেয়েছে নদী/ডি(প)কলে পানি তাতে ঢালো/৮+৯ (১০)
জলের পিরান খুলে/নদীগুলো মরু হয়ে হাঁটে/ ৮+১০
হাইব্রিড খেও ফেলে/ চিটার আগুন জিভে চাটে/। ৮+১০
(চোখের মণিতে জ্বলে: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
ছন্দের মাত্রাগণনার পাশাপাশি কবিতার আরেকটি অপূর্ব সৌন্দর্য হলো অন্ত্যানুপ্রাসের যথোপযুক্ত ব্যবহার। কবি সেই অলংকারকে যুৎসই মধুরতায় নির্ভেজাল ব্যবহার করতে পেরেছেন। কবির প্রতিটি সনেট মাত্রাগণনার গাণিতিক প্রজ্ঞায় বিচার করলে যেমন কোনও ত্রুটি ধরা পড়বে না ঠিক তেমনি অন্ত্যমিলের অসম বিন্যাস চোখে পড়বে না। কিংবা পড়তে কোথাও জড়তায় আড়ষ্ট হবেন না। কিংবা পড়ার যে গতি থাকে সেই গতিতে কোনোরূপ বাধাপ্রাপ্ত হবেন না। এখানেই কবির সবচেয়ে সুন্দর কাব্যিক মুনশিয়ানা।
‘চোখের মণিতে জ্বলে’ কবিতার অন্ত্যমিলে দেখা যায়; তিনি অন্ত্যমিল সাজিয়েছেন এভাবে—
‘কখকখখ: কখকখখ: কখকখখ: ক-০-ক’।
প্রথম পঙক্তির অন্ত্যমিল= আলো-ঢালো, কাটে-হাঁটে-চাটে। ক-খ-ক-খ-খ
দি¦তীয় পঙক্তির অন্ত্যমিল= বন্ধু- সিন্ধু, মাছ-কাচ-গাছ। ক-খ-ক-খ-খ
তৃতীয় পঙক্তির অন্ত্যমিল= (পাপ)ড়িতে- যেতে, রাত-হাত-কাত। ক-খ-ক-খ-খ
চতুর্থ পঙক্তির অন্ত্যমিল= (কু)সুম-চুম। ক-ক
‘চোখের মণিতে জ্বলে’ কবিতায় শেষ পঙক্তির সপ্তদশ চরণের সাথে কোনও অন্ত্যমিল দেওয়া হয়নি। অন্ত্যমিলের (ক-খ-ক-খ-খ) ধারণাকে আরও সহজ করে বুঝার জন্য কবিতার একটি পঙক্তি উদাহরণ হিশেবে পেশ করা যায়—
‘গঙ্গার গেলাস হাতে টিপাই'র নাক টিপে বন্ধু—ক
বণিকের বর্জ্যে মরে চঞ্চল খলসে পুঁটিমাছ —খ
নাড়ির নীরব টানে নির্জনেই কেঁদে মরে সিন্ধু —ক
একুরিয়ামে মাছেরা ভালোবাসে চারপাশে কাচ —খ
শিশুরা বামুন হয় ঘরে দেখে বনসাই গাছ।’ —খ
(চোখের মণিতে জ্বলে: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
এই নিয়মে ‘জোড়া পাখির রুমাল’- গ্রন্থের ‘গেরুয়া গায়ক পাখি’ কবিতায় একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে।
গেরুয়া গায়ক পাখি গেয়ে যায় অন্তর বাগানে —ক
জারিসারি সঙ্গীতের বাণী বাউরি বাতাসে দোলে —খ
দেহতত্ব বৃক্ষ ভেদে শিকড়ের সুর তুলে আনে —ক
পরতে পরতে মাটি দেহের জীবাশ্ম টেনে খোলে—খ
আদিসুর মূর্ছনার স্বরলিপি এই মন ভোলে। —খ
‘জোড়া পাখির রুমাল’- গ্রন্থের ‘আত্মার ভাঁজপত্র’ ‘দৃষ্টির দ্যুতি গেঁথে’ ‘জোড়াপাখি ফুলের রুমাল’ ‘সোমন্ত ঘুঙুর’ ‘ সার্কাস’ ‘ঝাউগাছ ও নয়াবউ’ ‘বসন্ত বিলাপ’ ‘পালাগান’ ‘আঁধারের নাকফুল’ গ্রন্থের শিরোনামীয় কবিতা ‘আঁধারের নাকফুল’ ‘করতলে বৃক্ষের দাগ’ গ্রন্থের ‘ইতিহাস খেলা করে’ ‘সনির্বাচিত’ গ্রন্থের ‘আলোর বোতাম খুলে’ কবিতায় অন্ত্যমিলের ধারাটি রক্ষা করা হয়েছে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে অবলম্বণ করে সনেট-কবিতা লিখেছেন। তিনি ৮+৬=১৪ মাত্রায় সনেট নির্মাণ করেছেন। চৌদ্দমাত্রিক ছন্দকে পয়ারও বলা হয়। মধুসূদন সেই পয়ার ছন্দে সনেট রচনা করেছেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে আশ্রয় করে কবি মনসুর আজিজও অষ্টাদশী কবিতা রচনা করেন। এবার দেখা যাক— তিনি অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ব্যবহারে কতটুকু দক্ষতা দেখাতে পেরেছেন। ছন্দ বুঝতে হলে যেকোনও কবিতার দুটি চরণ গণনা করলেই ছন্দের মাত্রা গণনার ধারণা পাওয়া যায়। এবার এক্ষেত্রে ‘প্রেমের সুবাস বয় কৃত্রিম ফুলের পাপড়িতে/বাসর সজ্জায় বাসিদেহ টানে না বিনিদ্র রাত’ চরণদুটি পর্যালোচনা করে তার ছন্দজ্ঞান অনুধাবন করা যাবে।
‘প্রেমের সুবাস বয়’—এটি ৮মাত্রার একটি পর্ব। প্রতিটি চরণে (৮+১০) দুটিপর্ব রেখে কবিতার চরণ সাজিয়েছেন। প্রথমপর্বে ৮ মাত্রা এবং দ্বিতীয়পর্বে ১০ মাত্রার মর্যাদা দিয়েছেন। ৮ মাত্রার পর্বে দেখা যায়— তিনটি শব্দ আছে। প্রতিটি শব্দে ৩+৩+২=৮ মাত্রা আছে। ‘প্রে/মে/র=১+১+১=৩, সু/বা/স/=১+১+১=৩, বয়=১+১=২। দ্বিতীয় পর্বে আছে— কৃত্রিম/ ফুলের/ পাপড়িতে/=৩+৩+৩=৯ মাত্রা। কৃ/ত্রি/ম/=১+১+১=৩, ফু/লে/র/=১+১+১=৩, পাপ/ড়ি/তে/=১+১+১=৩ মোট ৯ (১০ মাত্রার মর্যাদা পাওয়ার কথা ছিল)
বাসর সজ্জায় বাসি/দেহ টানে না বিনিদ্র রাত’ এ-চরণে দেখা যায়—বা/স/র=১+১+১=৩ সজ্/জা/য়=১+১+১=৩ বা/সি=১+১=২ প্রথম পর্বে আছে; ৩+৩+২=৮
দে/হ=১+১=২ টা/নে/ না=১+১+১=৩ বি/নি/দ্র/=১+১+১=৩ রা/ত=১+১=২
দি্বতীয় পর্বে; ২+৩+৩+২= ১০
বিন্যস্ত প্রথম চরণের দ্বিতীয় পর্বে দেখা যায় ‘পাপড়িতে’ ৩ মাত্রার মর্যাদা পাওয়ার কারণে একটি মাত্রার কম মনে হয়েছে। কিন্তু আলোচ্য শব্দে দৃশ্যমান চারটি মাত্রায় রয়েছে যদি পাঠ করার সময় পাপোড়িতে উচ্চারণ করা যায়। তবে তা উচ্চারণ না করে পড়লেও কবিতার মর্যাদায় হানি ঘটবে না। কিংবা কবিতার অঙ্গহানি হবে না। এই কবিতাকে কখনও বিকলাঙ্গ কবিতা বলা যাবে না। নদীর ঢেউ খেলায়ও মাঝে মাঝ ঢেউয়ের পতন হয়। আর প্রায় বড় বড় বিজ্ঞ কবিদের কবিতায়ও এরকম ছন্দপতন মাঝে মাঝে হয়েছে।
‘দৃষ্টির দ্যুতি গেঁথে’— কবিতায় দারুণ একটা চমকলাগা ছন্দস্বাদ ধরা দিয়েছে। আঠারো চরণের প্রতিটি চরণে দুটি ছন্দ পাশাপাশি স্থাপিত হয়েছে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দ এবং মাত্রাবৃত্ত ছন্দ। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে গণনা করলে ছন্দের কোনও পতন ঘটে না। অন্যদিকে মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও পতন ঘটেনি। এ-হিসাব যদি সত্যি হয়; তাহলে এ-কবিতাটি দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত সনেটে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের স্থলে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের আবির্ভাব। দ্বিতীয়ত একছন্দের ভিতরে আরেকছন্দের জীবন দান। একটি কবিতার শরীরে ছন্দের দুটি নীতিকে সমান্তরাল ব্যবহার করা অতটা সহজ নয়। তবুও মনসুর আজিজ সেই সক্ষমতা দেখাতে পেরেছেন। মাত্রাক্ষরিক ছন্দও আছে তা কবি প্রায়োগিক সক্ষমতায় প্রমাণ দেখিয়েছেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মাত্রা গণনা করলে অন্যান্য কবিতার রীতিকেই (৮+১০) প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাত্রাবৃত্ত ছন্দে হিসাব করলে দেখা যায় কবিতার প্রতিটি চরণে তিনপর্বের ষড়মাত্রিক (৬+৬+ ৬) রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। ‘দৃষ্টির দ্যুতি গেঁথে’—কবিতার একটি পঙক্তি উদাহরণ হিশেবে দেওয়া হলো—
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মাত্রাবিন্যাস—
খাঁটি সোনা পুড়ে গড়ি/ নাকঠাসা মাদুলি; হোনার/৮+১০
দৃষ্টির দ্যুতি গেঁথে/ সাতনরী হার গড়ি আমি/ ৮+১০
সুখের রঙিন শাড়ি/ মাকু টেনে বানাই তোমার /৮+১০
ধানরঙ সোনাভানু/ মমতাজ হয়ে আসে নামি/ ৮+১০
সুপারির রাঙা গাল /বিমুগ্ধ দুহাতে কতো দামি/৮+১০
মাত্রাবৃত্ত ছন্দের মাত্রাবিন্যাস—
খাঁটি সোনা পুড়ে/ গড়ি নাকঠাসা/ মাদুলি; হোনার/(৬+৬+ ৬)
দৃষ্টির দ্যুতি/ গেঁথে সাতনরী/ হার গড়ি আমি/ (৬+৬+ ৬)
সুখের রঙিন/ শাড়ি মাকু টেনে/ বানাই তোমার /(৬+৬+ ৬)
ধানরঙ সোনা/ভানু মমতাজ/ হয়ে আসে নামি/ (৬+৬+ ৬)
সুপারির রাঙা/ গাল বিমুগ্ধ দু/হাতে কতো দামি/(৬+৬+ ৬)
দুটি ছন্দের শিল্পতাৎপর্য আলোকপাত করলে কিংবা দুটি ছন্দের প্রতিযোগিতা করলে মাত্রাবৃত্ত ছন্দ বিজয়ী হবে। অক্ষরবৃত্তে সামান্য হেরফের থাকলেও মাত্রাবৃত্তের বুনন অতীব যুৎসই। এখানে বলে রাখা ভালো, কবি মনসুর আজিজ বাংলা ছন্দের প্রতিটি শাখায় বিচরণ করলেও কেন জানি মনে হয় মাত্রাবৃত্ত ছন্দটি কবির হাতে নিরাপদ। একজন অভিজ্ঞ ছান্দসিক শিল্পীর মতো কবি মাত্রাবৃত্তকে গভীরভাবে আত্মস্থ করতে পেরেছেন। যে কবি ছন্দের জ্ঞানে পূর্ণতা আছে সে কবির হাতে সর্বশ্রেণির কাব্যশিল্প নিপুণ-নিখুঁত শিল্পে রূপলাভ করা সম্ভব। ছন্দজ্ঞান থাকলে কবিতার শরীর নির্মাণে শিল্পীর ইচ্ছামতো পুতুল গড়ার মতো কবিতাগড়া সম্ভব। কবি মনসুর আজিজ সেই মানের একজন শিল্পী তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
অন্ত্যমিলের ক্ষেত্রে কবি কিছু-নিরীক্ষা করেছেন। ‘চোখের মণিতে জ্বলে’—কবিতায় যে অন্ত্যানুপ্রাসের (‘ক-খ-ক-খ-খ: ক-খ-ক-খ-খ: ক-খ-ক-খ-খ: ক-০-ক’) সাক্ষাত হয়েছে ‘স্বপনের মধুবনে’— কবিতায় সেই মিলবন্ধন পাওয়া গেল না। এখানে কিছু ব্যতিক্রমী অন্ত্যমিল দেখা যাচ্ছে। এখানে প্রতিটি প্রতিটি পঙক্তির দ্বিতীয় চরণে কোনও অন্ত্যমিল রাখেননি। পরবর্তী সময়ে এ-নীতিতে কবি বহু-কবিতা রচনা করেন। এক্ষেত্রে অন্ত্যমিল সূত্রটি দাঁড়ায় —(‘ ক-০-খ-খ-ক: ক-০-খ-খ-ক: ক-০-খ-খ-ক: ক-০-ক’)
কবির রচিত ‘স্বপনের মধুবনে’—কবিতা মাধ্যমে ব্যাপারটা পরিষ্কার করা যাক—
জলকচুরির মতো ভাঁজে ভাঁজে ছিল রূপ রস —ক
জলতরঙ্গের মতো বেজে ওঠে তোমার ছোঁয়ায় — ০
বাঁকা চাঁদ জোড়া দিলে তারপর হয় যদি ঠোঁট —খ
কামের আগুন তাতে মুখে পুরে ভাবো আখরোট —খ
থাকে না ব্যাকুল মনে, মন দিলে নাম খ্যাতি যশ।—ক
(স্বপনের মধুবনে: সুনির্বাচিত কবিতা)
‘আত্মারা খামারে ফিরে যাবে’ কবিতায় এসে কবি আরেকবার মিলনীতি-নিরীক্ষা করেছেন। এই কবিতার প্রথম পঙক্তিতে অন্ত্যমিলে অন্যরকম মেলবন্ধন তৈরি করেছেন। অন্যান্য পঙক্তিতে (ক-০-খ-খ-ক) আগের নিয়ম রক্ষিত হয়েছে। ‘আত্মারা খামারে ফিরে যাবে’ কবিতার প্রথম পঙক্তিতে দেখা যায় (ক-খ-খ-ক-ক) প্রথম-চতুর্থ-পঞ্চম-দ্বিতীয়-তৃতীয় চরণে অন্ত্যমিল। নিচে উদাহরণ দেওয়া যাক—
‘রোদের জিহবা চেটে খায় কালো মানুষের পিঠ — ক
পোড়ে পেট সংসার বিলিকাটে অলিগলি সব —খ
ফুলের পাহারা দিয়ে মধুমাছি কানে তোলে রব —ক
রেণুর গোপন কোষে মধু পান করে যায় কীট —ক
মানুষেরা পুড়ে পুড়ে হয়ে গেছে প্রাসাদের ইট।’’ —ক
(‘আত্মারা খামারে ফিরে যাবে’)
‘আঁধারের নাকফুল’ কাব্যগ্রন্থের ‘আমার মনের গহীন বনে’ কবিতাটি পাঠ করলে আরও বেশি মুগ্ধ হতে হয়। স্বরবৃত্ত ছন্দেও সনেট লেখা যায় তারও একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ আছে। যেমন—
জলের মাঝে/ জলের রেখা/ খুঁজতে গেলাম/ আজ/ ৪+৪+৪+১=১৩
আলোর মাঝে/ যায় কি পাওয়া/ বালি রেখার/ ভাঁজ/৪+৪+৪+১=১৩
বিজলি চমক/ ধরতে গেলে/ রূপের ঝলক/ দেখে/৪+৪+৪+২=১৪
প্রভাতবেলার/ মাখন আলো/ একটু নিলাম/ মেখে/।’৪+৪+৪+২=১৪
(‘আঁধারের নাকফুল’: ‘আমার মনের গহীন বনে’)
কবি মনসুর আজিজ কবিতা নির্মাণে অলঙ্কারশাস্ত্রের বিধান মেনে কবিতার অঙ্গসজ্জা করেন। ছন্দের বহুবিধ ব্যবহারে কবির দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা এবং নিরীক্ষার সুনিপুণ গাঁথুনি অসাধারণ। অপূর্ব-প্রজ্ঞায় ভাব-জগতে বিচরণ করে পৃথিবীর বিচিত্র রূপকে চিত্রায়িত করেছেন। কবিতার ভাব-বিষয়কে কবি হৃদয়ের গহীন অনুভব দিয়ে প্রবল-যত্নে চরণে চরণে মুখরিত করেছেন। প্রকৃতির নানান উপকরণ সেলুলার ফিতার মতো ক্রমান্বয়ে বর্ণনা করার ক্ষমতা কবির মানসভূমি প্রস্তুত। কবিতার শরীর নির্মাণে যে কারুকাজখচিত নকশা প্রয়োজন একজন দক্ষ-শিল্পীর মতো সে সুন্দর প্রতিকৃতি দিতে মনসুর আজিজ সক্ষম।
অসংখ্য কবিতার জনক কবি মনসুর আজিজ। তিনি শিশুদের জন্য লিখেন। কিশোরদের জন্য লিখেন। বড়দের জন্য লিখেন। নিজের জন্যও লিখেন। সর্বশ্রেণির কাব্যশীলন নিয়ে আলোচনা করা ব্যাপক প্রস্তুতির দরকার। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা সাজানো যেতে পারে তার কবিতার প্রকৃত রূপবৈচিত্র। এই লেখাটি কেবল অষ্টাদশপদী সীমায় পরিব্যাপ্ত থাকুক। অষ্টাদশী কবিতা তার অপরাপর কবিতার মতোই বিষয়প্রবণ। ‘জোড়াপাখি ফুলের রুমাল’ কবিতাগ্রন্থের শিরোনামীয় কবিতাটি আলোচনা করা যাক। রুমালে অঙ্কিত ‘জোড়াপাখি’ আর ফুল। টিস্যুপেপারের যুগে রুমালের কথা আসলে সহৃদয়সংবেদশীল ব্যক্তি নিঃসন্দেহে স্মৃতিকাতর হয়ে যাবেন। এই তো কিছুদিন আগেও রুমাল ছিল সর্বোৎকৃষ্ট উপহার। রুমাল না থাকলে বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যেতো।
প্রিয়জন প্রিয়মানুষকে রুমাল দিয়ে অন্তরের ভাববিনিময় হতো। উপহারপ্রাপ্ত সেই রুমালকে জীবনের একটি অপরিহার্য চেতনার সাথে জড়িয়ে রাখতেন। সেই রুমাল বেশির ভাগ নারীহস্তে অঙ্কিত নকশায় রঙিন থাকতো। কবিতার একটি কি দুটি চরণে মনের ভাব প্রকাশ পেত। দুজনের প্রেম-সম্পর্ককে বুঝাতে জোড়াপাখির ছবি সুইসুতোর নিপুণতায় জীবন্ত হয়ে উঠতো। লেখা থাকতো ‘ভুলো না আমায়’ কিংবা যাও পাখি বলো তারে সে যেন ভুলে না মোরে’ এরকম নানান ছন্দবন্ধ আবেগমথিত কবিতার চরণ। তাই এগুলো জাতীয় জীবনধর্মে ঐতিহ্যের চিরায়িত নকশা। কবি মনসুর আজিজ সেই ঐতিহ্যকে সাঙ্গ করে একটি কবিতাগ্রন্থ লিখেছেন। সে মারফতে কবিকে অবলীলাক্রমে ঐতিহ্যের কবি বলে সম্বোধন করা যায়। ঘরগেরস্তে লুকিয়ে থাকা পূর্বপুরুষের পুরান-সম্পদ ঐতিহ্যপ্রেমিক চারুমনে দাগ কাটা স্বাভাবিক।
‘জোড়াপাখি ফুলের রুমাল’—কবিতায় কবি মনসুর আজিজ ঐতিহ্য-মনস্ক যে উপকরণ উচ্চারণ করেছেন তার কিছু নমুনা খোঁজা যেতে পারে। ‘মধুর মিলন. জোড়াপাখি, রুমাল, মুলিবাঁশ, সোনামুখি সুই, লাল সুতা ইত্যাদি শব্দগুলো আটপৌরে, ঘরোয়া, একেবারে গ্রামীণশিল্প। গ্রামবাংলার মধুর মধুর শব্দগুলো কবি তার কবিতার রূপালি জগতে চিকচিক করা সোনার ফসল হিশেবে গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে কবি প্রকৃতির নিবিড়-জগতে কল্পনার ভেলায় খুঁজে খুঁজে প্রাকৃতিক পরিচয়বাহী শব্দে জীবনধারায় স্বাভাবিক করে তুলেছেন। প্রকৃতি থেকে কবি যে রসদ বা কাব্যোপকরণ নিয়েছেন তার কিছুটা ‘জোড়াপাখি ফুলের রুমাল’ কবিতায় পাওয়া যায়। ফুল, আল, লাল, পাখি, ফুলের পাপড়ি, প্রজাপতি, সারারাত, সবুজ পাতায়, ভোর ইত্যাদি শব্দগুলো প্রকৃতির ঘ্রাণে বিমুগ্ধ-সজীব। এক সঞ্জীবনী সুধায় মানুষের মনকে ব্যাকুল করে তুলার মতো অনুভাব-অনুভূতি পাওয়া যায় এসব শব্দদ্যোতনায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো মনসুর আজিজের কবিতায় এরকম একটি প্রামাণ্যধারা কবির প্রতিটি কবিতায় স্পষ্ট।
‘মুলিবাঁশ ফাঁক করে লাজুক নজর প্রেমিকার’ —বাঁশ ফাঁক করে প্রেমিকার যে লাজুক চোখ কবিতায় অঙ্কিত হয়েছে তা কবিতাকে অলঙ্কার-সীমান্তে নিরাপদে চিত্রকল্পের পতাকা উড়াতে পেরেছেন। কবিতার বাঁকে বাঁকে চিত্রকল্পের পাল উড়িয়ে কবিতার নদীতে বজরা ভাসিয়ে চলছেন একনদী থেকে আরেক নদী। চিত্রকল্প নির্মাণ কবির যেন একটা নেশা। ‘সোনামুখি খোঁচা খেয়ে রক্ত হয় ফুলের পাপড়ি’— চরণটিতে কী চমৎকার চিত্রকল্প ধরা দিয়েছে। চরণটি পাঠ করলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সোনামুখি সুঁচ সেলাই করতে করতে যদি আঙুলে খোঁচা লাগে সাথে সাথে রক্ত বের হয়। কবি এ-চরণে এ-কথাকে প্রতিরূপে প্রতিবিম্ব করে হৃদয়ের রক্তক্ষরণকে রক্তাক্ত সুতোয় রুমালে পাপড়ি আঁকছে। এ-ভাবনা কতটা কাব্যিক কতটা প্রাসঙ্গিক কতটা হৃদয়গ্রাহী অনুভূতিপ্রবণ মানুষমাত্রই বুঝতে পারেন। ‘স্মৃতিগুলো সুতো হয়ে প্রতিদিন হাঁটে ক্যানভাসে’ এ-চরণে রুমালে ছবি আঁকতে আঁকতে শিল্পজীবন সেই ছবিতেই মিশে যায়। কবিও ছবির মতো স্মৃতির রুমালে মিশে যেতে পারেন এখানেই শিল্পের স¦ার্থকত। শিল্পী যখন শিল্পের ভেতরে একাকার হতে থাকেন শিল্প তখন জীবন্ত-সুন্দরে সজীব হয়ে ওঠে। সংস্কৃতিগুলো প্রতিদিন হাঁটে মনের ক্যানভাসে। নিত্যদিনের ভাবনায় কবির অষ্টপ্রহর কাটে শিল্পযোগ জীবনের সাথে। কবি মনসুর আজিজকে তাই বলা যায় নিত্যকার ধ্যানীশিল্পী।
কবি মনসুর আজিজ কবিতাকে গ্রহণ করেছেন শিল্পরূপে। তিনি খ্যাতির জন্য কবিতাকে সিঁড়ি হিশেবে বিবেচনা করেননি। পার্থিব খ্যাতি লাভের উৎস নয় বরং কবিতা মননবিশ্বের আচানক এক প্রশান্তিক জৌলুস। প্রশান্তির প্রত্যাশায় কবি ধ্যানমগ্ন হন। আত্মার অপূর্ব অধ্যয়ন হিশেবে কবি নিমগ্নচিত্তে জীবনদর্শন খোঁজার চেষ্টা করেন। শিল্প ক্রমান্বয়ে শিল্পোত্তীর্ণ হয়। এপারে আমি আর ওপারে তুমি মাঝখানে নদী শুধু বয়ে চলে যায়। মাঝখানে নদী— এই নদী-ই হচ্ছে শিল্পের ধ্যান। জীবন মৃত্যুর মাঝখানে কবিকে জীবন-সাধনা করতে হয়। জীবন-সাধনার চরম প্রতীক্ষায় থেকে পথিকের মতো পরম পাওয়ার জন্য একজীবন অপেক্ষা করতে হয়। কবি মনসুর আজিজ সেই পরমের ত্যাগী সাধক হিশেবে কাব্যসাধনা করেন। জীবনানন্দ দাশ পার্থিব-সুখকে বালিশের নিচে চাপা দিয়ে কবিতার সাধনাকে জীবনসঙ্গী করেছেন বলে আজকে তার কবিতা জীবন্ত হয়ে উঠেছে মানুষের মনে। তাই সাধনা কোনও দিন ম্রীয়মান হয় না— জ্যোতিষ্কের মতো নক্ষত্রের আলো পূর্ণিমার মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অক্ষয়রূপে প্রজ্ঞা ছড়িয়ে যায় যুগ থেকে যুগান্তরে। কবি মনসুর আজিজ সাহিত্যসাধনার এই সুন্দরকে গভীরভাবে আত্মস্থ করতে পেরেছেন।
‘জীবনের সঙ্গীতও সুর লয়ে বিভোর আপন
রক্তের সিম্ফনি এঁকে যায় বহুদূর তটরেখা
গেরুয়া গায়ক পাখি রেখে যায় তন্ত্রীতে কাঁপন।
(জোড়াপাখি ফুলের রুমাল: গেরুয়া গায়ক পাখি)
একটি কবিতার জন্য কবিকে অনেক সাধনা করতে হয়। অপেক্ষা করতে হয় অনেক রাত। ভাবতে হয় অনেককিছু। শিখতে হয় মহাবিদ্যা। আঁকতে হয় নানান রঙ। দেখতে হয় মহাবিশ্ব। ঘুরতে হয় পাতালপুরের অন্ধকূপে। তারপর একটি কবিতার জন্ম হতে পারে। কবিতার জন্য মনসুর আজিজের সেই সাধনার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ‘কবিতার ক্লোনিং’ কবিতায়—
‘আমি সারারাত জেগে থাকি; স্বপ্ন দেখি
ইলহামে খুঁজে ফিরি শান্তির কবিতা
পৃথিবীর প্রতিটি ভাষায় প্রতিটি দেশে আমার তল্লাস
একটি কবিতার ক্লোনিং
শান্তি দিবে পৃথিবীকে।’
(কবিতার ক্লোনিং: অনন্ত আকাশের জ্যোতির্ময় নক্ষত্র)
বাংলা কবিতায় ছন্দের নানা প্রকরণ আছে। নানাভাবে বাংলা কবিতা নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। বর্ণিল ছন্দের ধারায় কবিতার তটরেখায় ঢেউ ভাঙে। জার্মানি, ইটালিয়ান, চৈনিক, পারসিক, ফার্সিয়ান, ইন্ডিয়ান, লৌকিক, মোজেজেটিক ইত্যাদি নানান জাতির নানা ছন্দ বাংলা কাব্যে অনুপ্রবেশ করেছে। অপূর্ব কান্তিতে অবাক ছন্দে সুরেলা মাধুরী নিয়ে বাংলা কাব্য গতিশীল হয়েছে। ছন্দবৈচিত্রে বাংলাকবিতাকে দারুণভাবে প্লাবিত করেছে। বাংলা সাহিত্যের কাব্যসাধকেরা সেই সকল বিচিত্র ছন্দের ধারক বাহক হতে পেরেছেন। তাই বাংলাকাব্য যুগ যুগ ধরে ফুলের জলসা প্রাণভরে উপভোগ করছে। কবি মনসুর আজিজ এ-যুগের সেই সাধকগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিনিধি। তার-ই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় তার রচিত ‘শব্দের বেনারসি’ কবিতায়। শব্দের বেনারসি দিয়ে সাজায়ে প্রেমের কবিতা লেখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ছন্দের ঝরনা দিয়ে প্রজাপতির আভরণে কাব্যপ্রিয়াকে হৃদয় ছিঁড়ে বরণ করবেন। কবি বলেন—
‘ঝরনার ছন্দ কি তালে তালে আসে
বর্ণিল প্রজাপতি পরে আভরণ
অক্ষর, মাত্রা ও স্বর চোখে ভাসে
হৃদয় ছিঁড়ে তাকে করবো বরণ।’ (শব্দের বেনারসি)
‘হৃদয়ছেঁড়া’ শব্দ দিয়ে যখন কবিতা প্রকল্পিত হয় তখন রক্তক্ষরণের দারুণ মিষ্টিসিজম অনুভূতি প্রবল প্রতিবিম্বিত হয় মানব হৃদয়ে। রক্তের অক্ষরে লেখা হৃৎস্পন্দন হৃদয়কে দারুণভাবে উদ্বেলিত করে। কান্নাহাসির জীবনে আনে প্রাঞ্জল-প্রশান্তি। বিরহের আকুতি যখন মানুষের মনগহীনে জলপ্রহারে অশ্রুসিক্ত করে তখন মানুষের জমাকৃত মনের ব্যথা নিমিষে প্রশান্তি আনে। কবির কবিতা তাই স্বীকার করে।
‘শব্দের ফুলগুলো কবিতার মালা
প্রশান্তি খেলা করে দূর করে জ্বালা।’ (শব্দের বেনারসি)
‘কবিতার প্রতি’ কবিতাটিকে কবির কাব্যভাবনার মানসভূমি বলা যেতে পারে। আল মাহমুদের যেমন আছে ‘কবিতা এমন’ কবিতা তেমনি মনসুর আজিজের আছে ‘কবিতার প্রতি’। এই কবিতায় কবি কবিতার চমৎকার সংজ্ঞায়ন করেছেন। এখানে অনেক কথা আছে। বিশ্লেষণের মতো আছে অনেক লজিক। এখনকার সময়ে রচিত কিছু কবিতা আছে যেগুলো দুর্বোধ্য, শিউলি বকুলের গন্ধ নেই, পলির অভাবে কবিতা হয় কঙ্কাল অর্থাৎ এসব অপবৈশিষ্ট্যের কারণে কবিতা প্রাণ হারায়। কবিতা বিকলাঙ্গ হয়। কবিতা সজীব হয়ে ওঠে না। কবিতা আত্মায় স্পর্শ করে না। অপরদিকে কবিতা হলো যেসব কবিতায় ফুল ফোটে। যারা কালকে ধারণ করতে পারেন তারাই কবি। কবি কালান্তরমুখি। কবিতা হবে লাঙ্গলের ফলার তীক্ষ্ম। কবিতা শোষণের পথকে রূদ্ধ করে দেয়। কবিতা এনে দেয় স্বাধীনতা, কবিতা মায়ের সম্মান, মাটির সম্মান । কবিতা নিপুণ শব্দের গাঁথুনি। কবিতা বাদাম তোলা নাও। দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠ, সুপারি বাগান, পানের বরোজ। অবশেষে কবিতার কাছে কবি প্রার্থনা করে বলেছেন—
‘কবিতা তোমার কাছে করজোড় মিনতি
একবার মুক্তি দাও
আমার হৃদয়ের কবিতাকে।’ (কবিতার প্রতি’: মনুষ্যত্বের ল্যাম্পপোস্ট)
‘আমাকে ওমরের তরবারিটি দাও/ সবার আগে হত্যা করি নিজেকে।’ কবি নিজেকে হত্যা করতে চান। কিন্তু কেন এই আত্মহত্যা? আত্মহত্যা তো মহাপাপ। তারই একটা উত্তর আছে— ‘আমার বোধকে জাগিয়ে দাও/ চেতনায় বেঁধে দাও হাজার মৃত্যুর কাফন।’ ‘বোধের অনবরত নক্ষত্র’ কবিতায় কবি যখন দেখেন ফিলিস্তিনি শিশু নিজেকে সুইসাইডের প্রস্তুতি নেয়, নবজাতকের চোখে দেখেন ইহুদির প্রতি ঘৃণা অথচ সারা বিশ্বের মুসলিমরা ইহুদি সম্প্রদায়ের হাতে নির্মিত সরাবে বুদ হয় তখন কবির মনে জন্ম নেয় এক চরম বিদ্রোহ। মুসলিমনিধনে বিশ্বমোড়লেরা জানপ্রাণ চেষ্টা করে তখন মুসলিম বিশ্ব ঘুমে অচেতন। কবির চোখের সামনে ভেসে ওঠে একশ ত্রিশ কোটি মুসলমানের করুণ চোখ। সেই ঘুমন্ত মুসলিম সম্প্রদায়কে জাগানোর জন্য কবি প্রার্থনা করেন ওমরের তরবারি। মানুষের ভিতরে থাকা অমানুষকে হত্যা করতেই কবি এই আত্মাহুতিদর্শন বেছে নেন। মূলত এখানে পাপগ্রস্ত হত্যা নয় বরং জীবন বিসর্জন দিয়ে কোটি জীবন বাঁচানোর আকুতি প্রকাশ পেয়েছে।
চিত্রকল্প কবিতার ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য উপকরণ। কবিতার সৌন্দর্য-প্রকাশে চিত্রকল্পের বিকল্প নেই। তাই তো জীবনানন্দ দাশ বলেছেন ‘চিত্রকল্পই কবিতা’। চিত্রহীন কোনও শিল্প হতে পারে না। কবিতা পাঠকালে পাঠকরের সামনে চিত্রের একটি রিল ক্রমান্বয়ে ঘুরতে থাকবে। শব্দের চিত্তহারী মনোলোভা মধুময় লাবণ্যতা নিয়ে চিত্রকল্প কবিতা চাক্ষুষ করে প্রকাশ করে। অনুভব-প্রকল্পে নিরেট-ছোঁয়া মানুষের সকল্প-ধারাকে অবিকল-চেতনায় একটা গভীর স্পর্শ দিলে কবিতা মূর্তিমান শিল্পে রূপ নেয়। তখন বাহ্যিকদৃষ্টি ও অন্তরদৃষ্টির ঐকতান সৃষ্টি করে। কবি মনসুর আজিজের চিত্তকল্প ব্যবহারে ক্যারিশমাটিক কাব্যিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। কবির প্রতিটি কবিতায় চিত্রকল্পের উজ্জ্বল ব্যবহার দেখা যায়। চিত্রকল্পের প্রমাণ দিতে সকল কবিতার আলোচনা রাখা সম্ভব নয়। চিত্রকল্পের প্রমাণার্থে একটি কবিতা প্রসঙ্গত আলোকপাত করা যাক। ‘ঝাউগাছ ও নয়াবউ’ কবিতার ভিতরে খোঁজা যাক কবির ব্যবহার্য চিত্রকল্পের বিচিত্র ব্যবহার।
‘নয়াবউ লাজরাঙা হাসি দেয় ইতিউতি চায়
সোয়ামির লোমে দেখে ঝাউগাছ প্রতিরোধ ঝড়
চুড়ির হাসিতে স্বামী ছটফট মন উতলায়
কবুল শব্দে আপন; নয় কভু ক্ষণিকের পর
জীবন আশ্রয় নেয়া চির প্রশান্তির বাতিঘর।’
(ঝাউগাছ ও নয়াবউ: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
বউয়ের লাজরাঙা হাসি, সোয়ামির লোমে দেখে ঝাউগাছ, চুড়ির হাসিতে স্বামীর মন উতলা ইত্যাদি পর্বগ্রন্থিতে কী চমৎকার দৃশ্যায়ন। কী অপূর্ব বয়ানশক্তি। দৃষ্টিগ্রাহ্যে দারুণসব দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। উপমার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এইসব দৃশ্যগুলো পাঠকমনে উদ্বেল-আকুতি সৃষ্টি করে। স্বামীর লোমশবক্ষ যেন ঝাউগাছ। সেই ঝাউগাছ আবার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। নির্ভরতার কী ভাষা! নারী তার স্বামীকে কতটুকু ভরসা করলে বিপদ-প্রতিরোধে আত্মপ্রণয়ী ভাবতে পারে। কবি যেন নারীপুরুষের সেই চিরায়ত ভাবটুকু ভাবে রসে স্পর্শে অবিকল সুন্দরকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
‘নরম মদির দৃষ্টি ফালা করে অক্ষত হৃদয়
ঝাউশাখার বন্ধনে পুলকিত বউ শিহরিত
ঢেউয়ের শাড়ি খুলে ঝাউপাড়ে ফেনার উদয়
জোসনা কুসুম আলো ফুল হয়ে ঝরে অবারিত
বেলাজ স্বামীর হাত বিলিকাটে দেহে অবিরত।’
(ঝাউগাছ ও নয়াবউ: জোড়াপাখি ফুলের রুমাল)
‘দৃষ্টি ফালা করে অক্ষত হৃদয়’— নারী তার প্রিয়পুরুষকে দেখছে। পলকহীন তাকিয়ে আছে। সেই তাকানো প্রখর ও তীক্ষ্ম ধারালো। হৃদয়কে ফালা ফালা করে দিচ্ছে। কেবল একটা দৃষ্টি অথচ কত বাক্সময় করে কবি রূপচিত্রায়নে কী দারুণ দক্ষত দেখিয়েছেন। মাত্র কয়েক শব্দের মিতব্যয়ী ব্যবহারে কবির কবিপ্রতিমাকে কত বিচিত্র-ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন।
‘ঢেউয়ের শাড়ি খুলে ফেনার উদয়’— এখানে মূলশব্দ ঢেউ। কীসের ঢেউ? ‘পুলকিত বউ শিহরিত’— শিহরিত বউয়ের আনন্দকে প্রকাশ করতে এখানে ‘ঢেউ’ শব্দের অবতারণা। অথচ ‘ঢেউ’ একটিমাত্র শব্দ। ‘ঢেউ’ শব্দটিকে আরও জোরালোভাবে প্রকাশ করতে উপমা হিশেবে আনলেন ‘শাড়ি’। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ‘ঢেউয়ের শাড়ি’ স্রোতে ঢেউ ওঠে, বাতাসে শাড়ি ওড়ে। স¦ভাবে ঢেউ এবং শাড়ি একই সৌন্দর্যের সমান্তর। ঢেউ খেলতে খেলতে ফেনা হয়। এই ফেনা সেই নারীর আনন্দের চূড়ান্ত অধ্যায়। নারী-পুরুষের গভীর সম্পর্কে কবি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রকৃতির মেলবন্ধন তৈরি করতে পেরেছেন। এখানেই কবির সার্থকতা।
কেবল প্রেম-সংরাগে রঙিন হয়নি কবির অষ্টাদশপদী কবিতার শরীর। কেবল ধ্রুপদি-সত্যে প্রাণস্পর্শী হয়নি। কেবল প্রকৃতির প্রখর-ভাবনা ও সৌন্দর্য-প্রীতিতে মুগ্ধ করেনি কবিতার ধ্যান। কেবল ছন্দের কারুকার্যে পরিপুষ্ট হয়নি কবির দোলায়িত প্রাণ। উপমা-উৎপ্রেক্ষার জ্যোতি কিংবা চিত্রকল্পের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় কবি শ্রমজীবী মানুষের কথাও বলেছেন। পরাবাস্তব-ভাবনাকে পুঞ্জি করে মানুষের অসহায়ত্বকে বেদনার
গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে কবি প্রত্যক্ষ করেছেন।
‘রোদের জিহবা চেটে খায় কালো মানুষের পিঠ
পোড়ে পেট সংসার বিলিকাটে অলিগলি সব
ফুলের পাহারা দিয়ে মধুমাছি কানে তোলে রব
রেণুর গোপন কোষে মধু পান করে যায় কীট
মানুষেরা পুড়ে পুড়ে হয়ে গেছে প্রাসাদের ইট।’
আত্মারা খামারে ফিরে যাবে ‘রোদের জিহবা চেটে খায় কালো মানুষের পিঠ’— রোদ যতই কাব্যময় হোক গরীব-অসহায়, খেটে খাওয়া মানুষের কাছে এক যমদূত। কঠিনতম অভিজ্ঞতা না থাকলে ‘রোদপোড়া দেহ’র দগ্ধস্মৃতি বর্ণনা করা সত্যিই দুরূহ। ‘ রোদের জিহ্বা চেটে খায়’ মানুষের পিঠ। খামারে কাজ করে কৃষক। ঠেলাঅলা, রিক্সাশ্রমিক, মোটে-জেলে, নৌকার শ্রমিক, বালুর শ্রমিক, মাটিকাটা শ্রমিক ইত্যাদি সকলপ্রকার শ্রমিককে কবি একটি সমাসবদ্ধ একটি শব্দে নিয়ে এসেছেন। কালোমানুষ। সেই কালোমানুষটি পিঠখোলা। শরীরে জামা নেই। জামাহীন শরীরে মেলে ধরেছে রোদের অগ্নিতলে। সেই রোদ তার তেজ দিয়ে কালো মানুষের পিঠ জ্বালিয়ে দিচ্ছে। একটু অনুভব করলে অশ্রুকণা জেগে উঠবেই হৃদয়বান মানুষের চোখের কোণে। সেই অনুভূতি কবি মনসুর আজিজ কবিতাগ্রাহ্য ভাষায় তুলে এনেছেন।
‘মানুষেরা পুড়ে পুড়ে হয়ে গেছে প্রাসাদের ইট’— মানুষের কঠিন বাস্তবতা বুঝতে উপন্যাসের মতো কাহিনী পড়তে হয় না। কবিতার এরকম একটি চরণই যথেষ্ট। কবিতা তো মানুষের কথাই বলে। মানুষ যেভাবে বেড়ে ওঠা আর কবিতার বেড়ে ওঠার মাঝে তেমন কোনও পার্থক্য নেই। কবিতা মানুষের সৃষ্টি। মানুষ সমাজ থেকে উঠে আসা এক অভিজ্ঞপুথি। কবি ভাবকে বাস্তবের ঠিকানা দিয়ে গতি কিংবা গন্তব্যে যেতে সড়ক নির্মাণ করেন। সমাজে ছড়িয়ে থাকা গুপ্ত-অনুভবকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তুলে আনেন। তারপর নির্মাণ করেন শিল্পের সুনিপুণ ইমারত। কবি মনসুর আজিজের অন্তর্দৃষ্টি অপরিমেয়। অতলস্পর্শী দৃষ্টিশক্তির প্রখরতায় প্রস্তুত করেন কবিতার কায়া। তাই তার কবিতা মানুষের মনকে স্পর্শ করবে। মানুষের আবেগ ধরে টান মারার ক্ষমতা এই কবির আছে। কালকে স্পর্শ করবে। কালে কালে পঠিত হবে কবি মনসুর আজিজের কবিতা। কালোত্তীর্ণ সত্যে কবি যুগে যুগে সত্যায়িত হবেন।
পৃথিবীর কবিতা কখনও মরে না। কবিতা আজীবন প্রাণময়। কবিতার ভাষা আছে প্রাণ আছে। শব্দে শব্দে কবি রচনা করেন সমাজতত্ত্বের দার্শনিক ভাষ্য। তাই কবিতা বিজ্ঞান-পথের বিজ্ঞতম চিন্তাসূত্র। কবিতার যেহেতু এত মান-ফরমান এত সম্মান সেহেতু কবিদের হতাশ হবার সুযোগ নেই। বরং হতাশজীবনের আশাময় ভাবগত সঙ্গীত হয়ে কবিতা প্রবহমান শিল্প। মনসুর আজিজের কবিতা শানে-শওকতে প্রকৃষ্ট-শিল্পের অতুলনীয় প্রকাশ। কবির রচিত অষ্টাদশপদী কবিতা বাংলা কাব্যসাহিত্যে নতুন একটি সম্ভাবনা হয়ে মানোত্তীর্ণ কালোত্তীর্ণ পথে এগিয়ে যাবে।
আরটিভি/এমএম



