
আজ বিশ্ব হাতি দিবস। শেরপুরের গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে বাড়ছে বন্যহাতির সংখ্যা। কিন্তু সংকুচিত হচ্ছে বিচরণক্ষেত্র। মূলত বন দখল করে বসতি স্থাপন, অবাধে গাছ নিধন, অবৈধভাবে বালি-পাথর উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পাহাড়ি ঝিরি-ঝরণা শুকিয়ে যাওয়ায় হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যভাণ্ডার কমে গেছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হাতির নেমে আসার ঘটনা বাড়ছে।
একইসঙ্গে মানুষের অসচেতনতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে বাড়ছে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বও।
এই দ্বন্দ্বে যেমন মানুষের হতাহত ও সম্পদহানি ঘটছে, তেমনি ঝুঁকির মুখে পড়ছে বন্যহাতির জীবনও। গুলি, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কিংবা বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে হাতি মারা পড়ছে।
বন্যহাতির দল ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের জঙ্গল থেকে সীমান্ত পার হয়ে শেরপুরের বনাঞ্চলে বিচরণ করত। বর্তমানে বেশকিছু হাতি স্থায়ীভাবেই এখানে বসবাস ও বিচরণ করছে। এজন্য বন্যহাতি সুরক্ষায় শেরপুরের পাহাড়ি জনপদে হাতির অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন পরিবেশ ও প্রকৃতিপ্রেমীরা।
এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব হাতি দিবস। আনুষ্ঠানিক বৈশ্বিক প্রচারণার এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ও বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণী সুরক্ষার বিষয়টিকে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে এবারের প্রচারণাটি বন্য পরিবেশে হাতিদের প্রদর্শিত মৌলিক গুণাবলি, যেমন: সহমর্মিতা, প্রজ্ঞা, দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, সহনশীলতা এবং সচেতন ও দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধান নিজ জীবনে ধারণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলার রাংটিয়া রেঞ্জ, শ্রীবরদীর বালিজুড়ি রেঞ্জ এবং নালিতাবাড়ীর মধুটিলা রেঞ্জে ‘হাতির খবরাখবর ও সচেতনতা’ গ্রুপ, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটি, বনবিভাগসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে আলোচনা সভা, মানববন্ধন ও পদযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
বাড়ছে হাতির সংখ্যা
প্রায় এক দশক আগে আইইউসিএনের এক জরিপে শেরপুরের বনাঞ্চলে ১২০ থেকে ১২৫টি হাতি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই জরিপে সব হাতিকেই পরিযায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব হাতিকে ‘এশিয়ান হাতি’ বলা হয়। বর্তমানে এই এশিয়ান হাতিগুলো অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ভারত থেকে আসা এসব বন্যহাতি শেরপুরের সীমান্তবর্তী ৮ হাজার ৩৭৬ একরের বনভূমিতে বিচরণ করে। ধান ও কাঁঠালের মৌসুমে খাদ্যের সন্ধানে প্রতি রাতে হাতিগুলো পাল বেঁধে চলে আসে সমতলে।
বনবিভাগের একটি সূত্র জানায়, গত ৩ বছরে অন্তত ৫৫টি হাতি শাবকের জন্ম হয়েছে বলে বনবিভাগের অনুমান। ইতোপূর্বে গারো পাহাড়ে ১০০ থেকে ১২০টি বন্যহাতির বিচরণ লক্ষ করা গেলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ১৮০ থেকে ২০০টিতে দাঁড়িয়েছে বলে বন কর্মকর্তাদের ধারণা।
বন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গারো পাহাড়ে ক্রমাগত প্রজননে বন্যহাতির বংশবিস্তার ঘটছে। বাংলাদেশ থেকে এশিয়ান প্রজাতির বন্যহাতির সংখ্যা দিন দিন বিলুপ্তির পথে বলে হাতি গবেষকগণ উদ্বেগ জানালেও গারো পাহাড়ে আশার আলো দেখছেন বন কর্মকর্তারা। হাতির প্রতিটি পালেই বিভিন্ন বয়সের বাচ্চা হাতি দেখা যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি ড্রোন ক্যামেরায় বনের ভেতর ৩৪টি হাতির একটি পালে ৮ থেকে ১০টি বাচ্চা দেখা গেছে বলে জানিয়েছে বনবিভাগ।
বন বিভাগের দাবি, যদিও ৪ বছর পর পর হাতি শাবকের জন্ম দেয়, কিন্তু গারো পাহাড়ের শেরপুর অঞ্চলে হাতির আবাসস্থল বৃদ্ধি ও খাদ্য সংকট কমে আসার কারণে দিন দিন এই বন্যপ্রাণীটির সংখ্যা বাড়ছে।
১৬ বছরে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বে নিহত ৪৭
বনবিভাগের তথ্যমতে, শেরপুরের শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার পাহাড়ি জনপদে গত ১৬ বছরে (২০১০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে) মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বে প্রাণ গেছে ৪৭ জন মানুষের। একই সময়ে হাতি মারা গেছে ৩৫টি। এছাড়া হাতির আক্রমণে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ কয়েক কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে।
খাদ্য-পানির সংকটে লোকালয়ে হাতি
প্রকৃতিপ্রেমী শেরপুর বার্ড ক্লাবের সভাপতি সুজয় মাকার জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন ১৪০ থেকে ২৭০ কেজি খাবার এবং ২০০ থেকে ৩০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়।
বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বালিজুরি রেঞ্জের ৮ হাজার ৩৩০ একর বনভূমিতে বর্তমানে প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে, অথচ বনের বর্তমান পরিবেশ এদের জন্য মোটেও অনুকূল নয়। গত ১০-১৫ বছর ধরে হাতির লোকালয়ে আসার প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তাতেই বাড়ছে মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব।
শেরপুর জেলা প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের সভাপতি এবং অধ্যাপক আব্দুল কাদির বলেন, হাতি বাঁচলে বাঁচবে গারো পাহাড়। এটা আমাদের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রাণী। সেজন্য হাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য গারো পাগাড়কে বন্যহাতির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
বন পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ
শেরপুর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম জানান, মানুষ-হাতি সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে বনের পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে।
আরটিভি/এমএম


