
কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর লোভ ও স্বার্থের বলি হচ্ছে অসহায় হাতিসহ নানা বন্যপ্রাণী। মানুষের অবিবেচক কর্মকাণ্ড ও অবৈধ বাণিজ্যের কারণে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে এসব প্রাণীর জীবন। ঠিক সেই রকমের এক হাতি ‘বাহাদুরের’ সন্ধান মিলেছে বান্দরবানে।
স্বাধীনতা কী, মুক্তির আনন্দ কী, তার স্বাদ কেমন ? তা হয়ত ভুলেই গেছে পোষা হাতি ‘বাহাদুর’। বছরের পর বছর পায়ে লোহার শিকল বাধা অবস্থায় রয়েছে বাহাদুরের। বেঁচে থেকেও না বাঁচার জীবন কাটিয়েছে জীবনের ২৪টা বছর। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ৩৮ বছর। গহীন পাহাড়ে ভারী গাছ টেনে কেটে যাচ্ছে তার জীবন। এত পরিশ্রম করার পরেও মিলছে না কোন ভালো খাবার। সারাদিন গাছ টেনে ক্লান্ত হলে শিকল বাধা অবস্থায় খাবারের জন্য তাকে ছাড়া হয়। আশপাশের লতাপাতা খেয়ে কোনমতে বেঁচে আছে। লামা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দুর্গম ঘিলাপাড়া এলাকায় গেলে হাতি ‘বাহাদুর’ এর সাথে দেখা হয়। এই বন্দিদশায় শুধু বাহাদুরের না, এইরকম আরো ৭টি হাতির সন্ধান মিলেছে বান্দরবানের লামা উপজেলার বিভিন্ন দুর্গম এলাকায়। উপজেলার সদর ইউনিয়নের ঘিলাপাড়ায় ১টি, দোছড়ি এলাকায় ২টি, চিউনী খালের আগায় ১টি, রূপসীপাড়া ইউনিয়নের লামা খালের আগায় ২টি, সরই ইউনিয়নের লেমুপালং ও লুলাইং এলাকায় ২টি হাতি রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ঔদাসীন্য ও অমানবিক মনোভাবের কারণে হাতি গুলোর উপর চলছে একপ্রকার শারীরিক মানসিক নির্যাতন। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে পায়ে শিকল বাধা থাকায় হাতি বাহাদুর মানসিক দিক থেকেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাতির শরীর ও মন কোনটাই বোঝার মতো অবস্থায় ছিল না। হাতির মালিক বা গাছ ব্যবসায়ী শুধুমাত্র আয়ের জন্য বছরের পর বছর ওই হাতিটির উপর নির্মম ভাবে অত্যাচার চালানো হয়েছে। পরিচর্চা বলতেও যতসামান্য। ঘাস-পাতা ছাড়া হাতির কপালে কিছুই জোটেনি। অবহেলায়, পর্যাপ্ত যত্ন না পেয়ে হাতি গুলো শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
এদিকে হাতির মাহুত সিফার জানায়, দৈনিক ৬ হাজার টাকার দিয়ে গাছ টানার জন্য হাতিটিকে ভাড়া দেয়া হয়। একেক দিন একেক জায়গায় গাছ টানতে যায়। হাতির মালিকের বাড়ি সিলেট। বান্দরবনের লামা উপজেলায় গাছ টানার কাজে ব্যবহৃত হাতি গুলো সিলেট বন বিভাগের অধিনে লাইসেন্স রয়েছে।
ওই এলাকার হাতি লামায় কেন ? এমন প্রশ্ন করলে মাহুত সিফার বলেন, তা আমি জানিনা, মালিক বলতে পারবে। সে আরো জানায়, হাতিটির বয়স প্রায় ৩৮ বছর এবং গাছ টানার কাজে ব্যবহার হচ্ছে ২৪ বছরের অধিক সময় ধরে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে সদর ইউনিয়নের পোপা হেডম্যান পাড়ার একজন জানায়, অনেক সময় বড় গাছ টানতে গিয়ে হাতি মারা যায়। গতবছর আমাদের পাড়ার একটু উপরে একটি হাতি পাহাড় থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। তাকে চিকিৎসা করা হয়নি। বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে হাতিটি কয়েকদিন পরে মারা গেছে। মাঝে মধ্যে তাদের হাতি আমাদের জুম নষ্ট করে ফেলে। এই এলাকায় ছোট কিছু ব্যবসায়ী হাতির টানা গাছ জোত ব্যবসায়ী বাবুলকে বিক্রি করে। রূপসীপাড়াস্থ তার ডিপোতে গিয়ে এইসব অবৈধ গাছ, জোতের মধ্য দিয়ে পাচার হয়।
স্থানীয়রা জানান, বান্দরবানের লামার বন থেকে হাতির মাধ্যমে শতশত মাতৃবৃক্ষ ও বনজ ঔষধি গাছ কেটে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। এসব গাছ বন থেকে হাতি দিয়ে টেনে নিয়ে উপজেলার সদরে পৌরসভা, লামা ইউনিয়ন, সরই ইউনিয়নের বিভিন্ন ডিপোতে রাখা হয়। এছাড়া কেটে নেওয়া গাছ পরিবহনের জন্য পাহাড় কেটে, ঝিরির পানি প্রবাহ বন্ধ করে ৩০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফজুর রহমান জানান, ‘দুইবছর আগে হাতি এবং মাহুতকে লামা সদর ইউনিয়ন থেকে আটক করা হয়। বিভাগীয় মামলা দিয়ে তাদের আদালতে তোলা হয়। এ ঘটনায় বন আদালতে নিয়মিত মামলা করা হলে হাতিটি চকরিয়ার ডুলহাজারা সাফারি পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। শীঘ্রই হাতির অবস্থান রয়েছে এমন জায়গায় অভিযান করা হবে।
আরটিভি/ এসকেডি


