
যশোরে বাজতে শুরু করেছে শীতের আগমনী সুর। শীত মৌসুমকে সামনে রেখে এখন জেলার গাছিদের ব্যস্ত সময় পার হচ্ছে। কুড়াল, হাসুয়া ও দা হাতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তারা—ছেঁটে পরিষ্কার করা হচ্ছে খেজুরগাছ।
আর কিছুদিন পরই কনকনে সকালে গাছ থেকে নামবে মিষ্ট রস, যা জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু খেজুরের গুড় ও পাটালি। গ্রামবাংলার এই পরিচিত দৃশ্য নতুন করে ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্থানীয়রা।
‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’—প্রবাদটি আজ অবধি টিকে থাকলেও বাস্তবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে শত শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য। যশোরের খেজুর গুড় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেলেও বাগান সম্প্রসারণ ও গুড় উৎপাদনে দৃশ্যমান সরকারি উদ্যোগের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। পাশাপাশি নিপাহ ভাইরাসের আতঙ্ক, নতুন গাছির অভাব এবং নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার কারণে সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি দিন দিন ঝুকির মুখে পড়ছে।
পূর্বপুরুষদের পেশাকে আঁকড়ে ধরে আজও মানসম্মত গুড় তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় গাছিরা। চৌগাছার দক্ষ গাছি আব্দুল আলীম জানান, গত বছর ১১৭টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে তিনি প্রায় ৯০ হাজার টাকার গুড়-পাটালি বিক্রি করেছেন। গুড়ের গুণমান ভালো হওয়ায় তিনি ভালো অর্ডারও পান।
একই উপজেলার তরুণ গাছি আবদুল কুদ্দুস জানান, প্রবীণদের হাত ধরে আসা এই পেশায় তারা পণ্যের মান বজায় রেখে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে সচেষ্ট।
তবে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন যশোরের একমাত্র বাণিজ্যিক খেজুর বাগানের মালিক মামুন কাউছার। তিনি বলেন, এ খাতের সরকারি সহযোগিতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। খেজুরগাছের জন্য আলাদা কোনো প্রদর্শনী প্লট বা বাগান তৈরি করা হয় না; যা গড়ে উঠেছে তা ব্যক্তি কিংবা প্রাকৃতিক উদ্যোগে।
ভেজাল গুড়ের দাপটে আসল গুড় উৎপাদনকারীরা উৎসাহ হারাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি জানান, এক কেজি আসল গুড় তৈরি করতে প্রায় ১০ লিটার রসের প্রয়োজন হয়, যার উৎপাদন খরচই পড়ে প্রায় ১,৩০০ টাকা। গত বছর তিনি প্রতি কেজি খাটি গুড় ২,০০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। অথচ বাজারে ২৫০ টাকা কেজিতেও কথিত খেজুরের গুড় পাওয়া যায়, যা মোটেও আসল নয়। এই ভেজালের ভিড়ে খাঁটি গুড় উৎপাদনকারীরা লোকসানে পড়ছেন। এছাড়া বর্তমানে খেজুর গুড় রপ্তানিরও কোনো আইনি অনুমোদন নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যশোরে রস সংগ্রহের উপযোগী খেজুরগাছের সংখ্যা ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৬িটি। এসব গাছ থেকে এবার ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ লিটার রস এবং ৩ হাজার ৯০ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, যশোরের খেজুর গুড়ের যেমন সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। জিআই পণ্য হিসেবে নিরাপদ রস ও ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে আমরা উৎসাহিত করছি। তবে এখন পর্যন্ত গাছিদের জন্য সরাসরি কোনো আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি।
ঐতিহ্যের সুরক্ষা, ভেজাল রোধ এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে এই শিল্পে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত পদক্ষেপের এখনই উপযুক্ত সময় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরটিভি/এসএস



