
দেশের সেবায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে। ১৮ বছর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। চাকরিজীবনে পেয়েছেন বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু অবসরের পর নামের সামান্য ভুলে বন্ধ হয়ে গেছে তার অবসর ভাতা। ছয় বছর ধরে সেই ভাতা ফিরে পেতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরছেন। শেষ পর্যন্তও মেলেনি সমাধান। অসুস্থতা, চিকিৎসার ঋণ আর সংসারের অভাব-অনটনে এখন মানবেতর জীবন কাটছে এমনই অভিযোগ সাবেক এক সেনাসদস্যের।
ভুক্তভোগীর নাম মো.গোলাম কবির (সাবেক সৈনিক)। তার বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার চিত্রা গ্রামে। ১৯৭৯ সালের ১৭ জুলাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। প্রথম কর্মস্থল ছিল ৩৯-ই বেঙ্গল। মাসিক ১ হাজার ৬১০ টাকা বেতন এবং ৯৪০ টাকা ভাতা দিয়ে শুরু হয়েছিল তার কর্মজীবন। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ১৯৯৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে সৈনিক পদে অবসর গ্রহণ করেন।
অবসরের পর নিয়মিত ৫ হাজার ৬৬৫ টাকা করে ভাতা পেতেন। কিন্তু পরিচয়পত্রে নামের ভুলের কারণে ২০২০ সাল থেকে তার অবসর ভাতা বন্ধ রয়েছে। চাকরিতে যোগদানের সময় দেওয়া নামের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত পরিচয়পত্রের নামের অমিল থাকায় এ জটিলতার সৃষ্টি হয় বলে জানান তিনি। তার বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় নাম সংশোধনের প্রক্রিয়ায় আরও জটিলতায় পড়তে হয়েছে।
গোলাম কবির জানান, ভাতা ফিরে পেতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশোধন করেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও সমস্যার সমাধান হয়নি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তাকে জানানো হয়েছে, তিনি জীবিত আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিতে হবে।
তিনি আরও জানান, সেনাবাহিনী থেকে অবসরের সময় চট্টগ্রাম থেকে মাত্র ১৭ জন সদস্য অবসর নিয়েছিলেন। তবে তাদের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংরক্ষিত ছিল রাজশাহী সেনানিবাসে। ফলে যেকোনো প্রশাসনিক কাজের জন্য তাকে রাজশাহীতে যোগাযোগ করতে হয়। বারবার সমস্যার কথা জানিয়েও সেখান থেকে কার্যকর সমাধান পাননি।
এর মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা তার জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। মাথায় ব্রেন টিউমার ধরা পড়ায় অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে তাকে। মানুষের কাছে হাত পেতে টাকা ধার করে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। দীর্ঘদিন বিছানায় পড়ে ছিলেন। একদিকে চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে বন্ধ অবসর ভাতা—সব মিলিয়ে চরম সংকটে দিন কাটছে তার।
স্ত্রী মুকুল বেগম বলেন, স্বামীকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। আমাদের দুই ছেলে থাকলেও তারা বেকার। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে আবেদন, দ্রুত যেন আমাদের সমস্যার সমাধান করে অবসর ভাতা চালুর ব্যবস্থা করা হয়। পরিচয়পত্র সংশোধন করতে গিয়ে আমাদের লাখ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। যখন যে যেভাবে বলেছে, সেভাবেই কাগজপত্র নিয়ে ছুটেছি। শুধু ভাতাটা ফিরে পাওয়ার আশায়।
গোলাম কবিরের ভাতিজা মনসুর আহমেদ লিখন বলেন, আমার চাচা সেনাবাহিনীতে চাকরি করার সময় নিয়মিত বেতন-ভাতা, রেশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেতেন। কিন্তু নামের একটি ভুলের কারণে এখন তার অবসর ভাতা বন্ধ। এতে তার জীবনযাপন করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আমরা চাই, দ্রুত সমস্যার সমাধান করে তার প্রাপ্য ভাতা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
এ বিষয়ে মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতাউর রব্বী জানান, গোলাম কবির তার কাছে প্রত্যয়নপত্রের জন্য একটি আবেদন নিয়ে এসেছিলেন। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএম


