
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং নানা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আরটিভির পাবিপ্রবি সংবাদদাতা সাজ্জাদুল ইসলামের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে প্রায় ৩ মাস হয়েছে আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার মিশন ও ভিশন কী এবং আগামী চার বছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কোথায় দেখতে চান?
উপাচার্য: গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি সেসব ছাত্র-জনতাকে, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার এই তিন মাসকে আমি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখিনি, বরং শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও হৃদয়ের স্পন্দন বোঝার সময় হিসেবে দেখেছি।
আমার মিশন স্পষ্ট—পাবিপ্রবিকে সত্যিকারের মানুষ গড়ার পাশাপাশি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণার একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত করা। সার্টিফিকেট নির্ভরতার পরিবর্তে বাস্তবমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে চাই। আগামী চার বছরে আমার লক্ষ্য হলো এমন একটি সমৃদ্ধ গবেষণা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার করে পড়াশোনা ও গবেষণায় মনোনিবেশ করবে এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ব-দরবারে পাবিপ্রবিকে মর্যাদার আসনে নিয়ে যাবে।
আরটিভি: আন্তর্জাতিক র্যাংকিং ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে আপনার কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাধান কাজ হলো তার গবেষণা। আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক মেধাবী, তারা কিউ-১ ও কিউ-২ জার্নালে গত ১ বছরে ৮৬টি আর্টিকেল প্রকাশ করছে। শুধু একটু পরিচর্যা করলে এই সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিতে ইতোমধ্যে আমরা 'রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেল'-কে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছি। সম্প্রতি সিমাগো র্যাংকিংয়ে এনার্জি ক্যাটেগরিতে দ্বিতীয় এবং গণিতকে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে।
শিক্ষকদের পাশাপাশি স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও গবেষণায় অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা এমন গবেষণা করুক, যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালগুলোকে সমৃদ্ধ করবে। সেক্ষেত্রে, র্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উচ্চতায় পৌঁছে যাবে। যদিও আমাদের ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত কিছু দুর্বলতা রয়েছে। এটা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি।
আরটিভি: দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অ্যাকাডেমিক ও গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা?
উপাচার্য: চার দেয়ালে আটকে রেখে জ্ঞান কখনো বাড়ানো যায় না। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সেরা গবেষকদের সাথে কাজ করুক। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি (Exchange Program) চালু করা আমার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, যাতে আমাদের সন্তানরা শিকড়ে পা রেখে বিশ্বমঞ্চে বিচরণ করতে পারে।
আরটিভি: সরকারি, বেসরকারি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারিত্ব জোরদারে কী পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: আমার বুক কেঁপে ওঠে যখন দেখি একজন মেধাবী শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে বেকারত্বের হতাশায় ভুগছে। ইন্ডাস্ট্রি এবং অ্যাকাডেমিয়ার মধ্যকার এই বিশাল দূরত্ব আমাদের ঘোচাতেই হবে। আমরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে নিয়মিত 'জব ফেয়ার' এবং 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোলাবোরেশন'-এর আয়োজন করব। পাঠ্যক্রমকে আমরা এমনভাবে সাজাতে চাই যেন একজন শিক্ষার্থী পাস করার আগেই নিশ্চিত থাকে যে, তার দক্ষতা দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতের সরাসরি উপকারে আসবে। প্রস্তুতি স্বরূপ আমাদের কারিকুলাম প্রণয়নে ইন্ডাস্ট্রি থেকে একজন বিষয় বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইন্ডাস্ট্রি থেকে রিসোর্স পার্সন আমাদের শিক্ষার্থীদের পাঠদান করবেন।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দেড়যুগ পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়নি। সমাবর্তন নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
উপাচার্য: এটি অত্যন্ত বেদনার একটি বিষয়। একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের একটি হলো সমাবর্তন। এটি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যেখানে একজন বাবা বা মায়ের চোখের আনন্দাশ্রু তাদের জীবনের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। আমি আপনাদের মাধ্যমে আমার প্রাণের শিক্ষার্থীদের কথা দিচ্ছি, এই দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান খুব শীঘ্রই হবে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সমাবর্তন আয়োজনের আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করেছি (আমি নিজে দায়িত্ব নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছি। এ নিয়ে ২টি মিটিং সম্পন্ন হয়েছে।) এবং সমাবর্তন এখন আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়তন ৭৫ একরের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে কী ভাবছেন?
উপাচার্য: মুক্ত চিন্তা বিকাশের জন্য একটি উন্মুক্ত এবং সুবিশাল প্রাঙ্গণ অত্যন্ত জরুরি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বর্তমান ৩০ একর আয়তন ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ৭৫ একরে উন্নীত করার যে পরিকল্পনা রয়েছে, সেটি নিয়ে আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে গভীরভাবে কাজ করছি। এটি কেবল মাটি বা জমির সম্প্রসারণ নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নতির জন্য বিশাল এক ক্যানভাস তৈরি করার লড়াই। আমি আশা করি, খুব শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ৪৫ একর জমি।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন মাত্র ২১টি বিভাগ রয়েছে, নতুন বিভাগ চালুর কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
উপাচার্য: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে আমাদের পুরোনো ধ্যান-ধারণা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, বায়ো-ইনফরমেটিক্স এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো এখন সময়ের দাবি। দেশের প্রয়োজন এবং বৈশ্বিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও শিক্ষক নিশ্চিত করে আমরা যুগোপযোগী নতুন বিভাগ খোলার পরিকল্পনা করছি। স্বল্প ব্যবধানে ২-৩ টি নতুন বিভাগ (নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ফুড প্রিজারভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি, কমানিকেশ অ্যান্ড হেল্থ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট বিভাগ) চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগে শিক্ষক সংকট রয়েছে তা নিরসনে আপনার পরিকল্পনা কী এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দেবেন?
উপাচার্য: ইট-পাথরের দালান কখনো বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে না, শিক্ষকরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল রূপকার। শিক্ষক সংকট নিরসনে আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করব। তবে এখানে আমার অবস্থান অত্যন্ত কঠোর— নিয়োগের ক্ষেত্রে 'মেধা এবং যোগ্যতা' ছাড়া আর কোনো মাপকাঠি থাকবে না। স্বজনপ্রীতি বা কোনো ধরনের অনৈতিক প্রভাব এখানে স্থান পাবে না। আমি এমন শিক্ষক চাই, যারা ক্লাসরুমে শুধু পড়াবেন না, শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো ভালোও বাসবেন।
আরটিভি: গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে আপনার প্রশাসন কী কী উদ্যোগ নেবে?
উপাচার্য: মুখস্থ বিদ্যার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। আপনাদের মাধ্যমে একটা সুখবর দিতে চাই, গবেষণার জন্য সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরি স্থাপনের জন্য এবার ৪৮ কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহ দিতে 'রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড' চালু রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়, ভবিষ্যতে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচিত হবে তার নতুন নতুন উদ্ভাবন এবং পেটেন্টের জন্য।
আরটিভি: উপাচার্য হিসেবে শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার প্রত্যাশা কী; তাদেরকে কী বার্তা দিতে চান?
উপাচার্য: প্রিয় শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার একটাই বার্তা— তোমরা স্বপ্ন দেখতে ভয় পেয়ো না। আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার মূল দায়িত্ব তোমাদেরই। তোমাদের বিনয়, প্রজ্ঞা এবং সামগ্রিক অধ্যবসায় অন্যদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে কাজ করবে। তোমরাই হবে নতুন বাংলাদেশের অভিভাবক। মেধার বিকাশ ঘটিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার পাশাপাশি নিজেদের হৃদয়ে দেশপ্রেম ও মানবিকতাকে ধারণ করে গড়ে উঠবে তোমরা। মনে রাখবে, তোমাদের জন্য উপাচার্যের দরজা সবসময়ই খোলা। চলো, আমরা সবাই মিলে আমাদের প্রাণের পাবিপ্রবি-কে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যাই, যা নিয়ে পুরো বাংলাদেশ গর্ব করবে।
আরটিভি: শত ব্যস্ততার মাঝেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার।
উপাচার্য: আপনাকেও ধন্যবাদ।
আরটিভি/এসএস




