
রূপসা-ময়ূর নদীর স্নিগ্ধ হাওয়ায় ঘেরা ১০৬ একরের সবুজ তপোবন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। সেশনজট ও রাজনীতির কোলাহলমুক্ত প্রাঙ্গণটিতে আট টার্মের চেনা ছন্দে এগিয়ে চলে শিক্ষার্থীদের চার বছরের শিক্ষাজীবন। জ্ঞান, অন্বেষণ ও মুক্তচিন্তার এই পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্রে পরিণত করার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, একাডেমিক মানোন্নয়ন, গবেষণা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ নানা বিষয় নিয়ে আরটিভির খুবি সংবাদদাতা তানিয়া তাবাসসুমের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো.রেজাউল করিম।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনার প্রধান অগ্রাধিকার কী?
উপাচার্য: আমার প্রধান অগ্রাধিকার হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোয়ালিটি কালচার বা গুণগত শিক্ষার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষা কার্যক্রম, কারিকুলাম, গবেষণা, অবকাঠামো এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশকে বিশ্বমানের মর্যাদায় নিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি ডিসিপ্লিন 'ইনটেন্ট টু অ্যাপ্লাই' (আইটিএ) প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং এর মধ্যে ৭টি ডিসিপ্লিন চূড়ান্ত পর্যালোচনার ধাপে পৌঁছাল। আগামীতে এই আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনের পরিধি আরও বিস্তার করব।
আরটিভি: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনটি বলে আপনি মনে করেন?
উপাচার্য: আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি ও মূল সম্পদ হলো শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতার সংস্কৃতি। এখানকার মুক্ত পরিবেশেই সবাই মিলে শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় অবদান রাখছেন।
আরটিভি: নতুন কোনো ডিসিপ্লিন বা বিষয় খোলার পরিকল্পনা রয়েছে কি?
উপাচার্য: সময়ের চাহিদা ও বৈশ্বিক শ্রমবাজার বিবেচনা করে আমরা নতুন প্রোগ্রাম চালু করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্ভাব্য খাপ খাইয়ে নেওয়া বিষয় পর্যালোচনার জন্য গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে ১৬টি বিষয় খোলার ইতিবাচক প্রতিবেদন পেশ করেছে। প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদ সৃষ্টি, পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ মূল্যায়ন করে পর্যায়ক্রমে এগুলো শুরু করা হবে।
আরটিভি: শিক্ষার্থীরা যেন প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে ভয় না পায়, সেজন্য কোনো ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা আছে কি?
উপাচার্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি একাডেমিক ভবনে ইতোমধ্যে অভিযোগ বাক্স রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রবিষয়ক পরিচালকের দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিন প্রধানের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা তাদের অভিযোগ বা সমস্যার কথা জানাতে পারে। তবে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি এর যথাযথ নিষ্পত্তি এবং শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, সহজ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কোনো শিক্ষার্থী যেন অভিযোগ জানাতে গিয়ে ভয় বা সংকোচ বোধ না করে, সেটি নিশ্চিত করতে চাই।
আরটিভি: প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের দূরত্ব কমাতে কোনো পরিকল্পনা নিচ্ছেন?
উপাচার্য: শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়কে আমি অত্যন্ত গুরুত্ব দিই। বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের ক্লাসরুম ভিজিট করি এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের একাডেমিক সমস্যা, প্রত্যাশা ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে চিন্তা-পরামর্শ জানতে কথা বলি। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে তাদের কথা শুনলে সমস্যাগুলো আরও ভালোভাবে বোঝা যায়। এতে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দূরত্ব কমে এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।
আরটিভি: হলগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা আছে কিনা?
উপাচার্য: আবাসিক হলগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী হলগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে নারী হলে পুরুষ কর্মী নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
আরটিভি: আন্তর্জাতিক র্যাংকিং ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে আপনার কী পরিকল্পনা রয়েছে?
উপাচার্য: আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের সঙ্গে গবেষণার বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশেষ করে কিউ ওয়ান, কিউ টু ও স্কোপাস-ইনডেক্সড জার্নালে মানসম্মত গবেষণা প্রকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে থিসিস সাপোর্ট স্কিম চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা সহযোগিতা ও কোলাবোরেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরটিভি: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক অবস্থানকে গবেষণায় কীভাবে কাজে লাগাতে চান?
উপাচার্য: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক অবস্থান গবেষণার জন্য একটি বড় সুবিধা। সুন্দরবন, উপকূলীয় এলাকা, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, নগরায়ণ ও শিল্পায়নসহ নানা বিষয় নিয়ে গবেষণার সুযোগ রয়েছে। আমরা চাই উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা করে তার সমাধানে ভূমিকা রাখতে। এভাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব।
আরটিভি: আপনার মেয়াদ শেষে খুবিতে এমন কোন পরিবর্তন দেখতে চান, যা নিয়ে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি গর্ব করবে?
উপাচার্য: আমার মেয়াদ শেষে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি একাডেমিক পরিবেশ দেখতে চাই, যেখানে ইমপ্যাক্টফুল গবেষণা হবে, নলেজ প্রোডাকশন হবে এবং সেই জ্ঞান সমাজ ও দেশের কল্যাণে বাস্তব অবদান রাখবে। শিক্ষার্থীরা যেন শুধু ডিগ্রি অর্জন না করে গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার সক্ষমতা অর্জন করে, সেটিই আমার প্রত্যাশা।
আরটিভি: সামনের দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আরও এগিয়ে নিতে আপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে কী?
উপাচার্য: আগামী দিনগুলোতে বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে পাইকগাছা ক্যাম্পাস ও একটি ইন্টারন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সুপরিকল্পিত একাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে জয়েন্ট ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
আরটিভি: একজন শিক্ষক ও এখন উপাচার্য হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আপনার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?
উপাচার্য: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় আমার প্রাণের জায়গা। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমার জীবন ও স্বপ্নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম দেশ ও বিশ্বব্যাপী আরও বিস্তৃত হোক এবং এটি বাংলাদেশে একটি গ্লোবাল হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল, জলবায়ু পরিবর্তন, সুন্দরবন, কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সহযোগিতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম পছন্দের প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে—এটাই আমার প্রত্যাশা।
আরটিভি/এআর




