ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য ফেরাতে রাবিতে চিঠি উৎসব 

রাবি সংবাদদাতা, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনের সামনে চিঠি উৎসব : ছবি আরটিভি

একটা সময় প্রিয়জনের সঙ্গে মানুষের দূরবর্তী যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল চিঠি। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকা, খামের ভাঁজে লুকিয়ে থাকত প্রিয় মানুষের হাতের লেখা অজানা অনেক কথা। চিঠি ছিল দীর্ঘ অপেক্ষায় অনুভূতি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। এখন সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে, মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে বার্তা। কিন্তু হারিয়ে গেছে সন্তানের থেকে মায়ের, প্রেমিক থেকে প্রেমিকার চিঠি পাওয়ার সেই চিরচেনা অপেক্ষা।

হারিয়ে যাওয়া এই সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী চিঠি উৎসব ও স্টাম্প প্রদর্শনী।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনের সামনে দিনব্যাপী এমনই এক ব্যতিক্রমি আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।

যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লেখা চিঠি বিনামূল্যেই পোঁছে যাচ্ছে গন্তব্যে। কলম হাতে নিয়ে কেউ চিঠি লিখছেন মাকে, কেউ প্রিয়জনকে, কেউবা প্রাক্তনকে, প্রকাশ করেছেন মনের গোপন অনূভুতি।

চিঠি উৎসবে এসে সময়ের চাকায় পেছনে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিমা ইসলাম। মাকে চিঠি লিখতে গিয়ে তার মনে হয়েছে, তিনি ফিরে গেছেন নব্বইয়ের দশকে। যে সময়ে প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায় থাকত মানুষ, আর একটি চিঠি হাতে পেলেই আনন্দে মন ভরে উঠত।

ফাহিমা বলেন, বর্তমানে আমরা আধুনিক যুগে বাস করছি, যেখানে চিঠি লেখার প্রচলন প্রায় হারিয়ে গেছে। আজকের আয়োজনে মাকে চিঠি লিখে মনে হচ্ছে, যেন নব্বইয়ের দশকে ফিরে গেছি। আগের দিনে মানুষ চিঠি লিখত, প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায় থাকত এবং আবেগঘন মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিত। আজ চিঠি লিখে মায়ের সঙ্গে সেই সময়ের আবেগ অনুভব করতে পারছি।

তিনি আরও বলেন, কেউ বাবা-মাকে, কেউবা প্রিয়জনকে চিঠি লিখছেন। সব মিলিয়ে এটি একটি সুন্দর মুহূর্ত। আমি মনে করি, এই সংস্কৃতি ফিরে আসা উচিত। অন্তত এ ধরনের দিবস উপলক্ষে হলেও চিঠি লেখার প্রচলন ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

শুধু স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়া নয়, চিঠি উৎসব অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে মনের অব্যক্ত কথাগুলো প্রকাশের উপলক্ষ। মুখে বলা হয়ে ওঠেনি, এমন অনেক অনুভূতিই জায়গা করে নিচ্ছে কাগজের পাতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুস সবুরের কাছে চিঠি লেখা তেমনই এক অনুভূতির প্রকাশ।

আব্দুস সবুর বলেন, চিঠি লিখতে পেরে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারছি, যা কখনো প্রকাশ করা হয়নি। চিঠি লেখার সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্য। প্রিয়জন বা মনের মানুষের কাছে চিরকুট লিখে অনুভূতি প্রকাশের আলাদা আনন্দ রয়েছে। তাই চিঠি লেখার সংস্কৃতি আমাদের ধরে রাখা উচিত।

শিক্ষার্থীদের এমন আবেগ ও আগ্রহের মধ্য দিয়ে চিঠি উৎসব যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তির দ্রুতগতির যোগাযোগের বাইরেও অনুভূতি প্রকাশের নিজস্ব একটি জগৎ রয়েছে। যেখানে একটি চিঠি শুধু কয়েকটি বাক্যের সমষ্টি নয়; বরং তা হয়ে উঠতে পারে স্মৃতি, ভালোবাসা, অপেক্ষা আর না-বলা কথার একান্ত আশ্রয়।

আয়োজনটির উদ্দেশ্যও মূলত নতুন প্রজন্মকে সেই অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। রাজশাহীর পোস্টমাস্টার জেনারেল আল মাহমুদ বলেন, একসময় মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ডাকবিভাগ। সময়ের পরিবর্তনে চিঠি লেখার জায়গা দখল করে নিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। চিঠি পাওয়া, খুলে পড়া, জমিয়ে রাখা এবং মাঝেমধ্যে আবার পড়ার যে আনন্দ, তা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, আমরা চাই, মানুষ আবার সেই আনন্দ ও আবেগের জায়গায় ফিরে আসুক। চিঠি লেখার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে, তার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতেই আমাদের এ আয়োজন। আজ শিক্ষার্থীরা আসছেন, ঘুরছেন ও চিঠি লিখছেন। ডাকবিভাগ চিঠিগুলো সংগ্রহ করে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেবে। যারা চিঠি লিখতে চান, তারা বিনামূল্যে প্রিয়জন বা পছন্দের মানুষের কাছে চিঠি পাঠাতে পারবেন।

আল মাহমুদ মনে করেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মুঠোফোনেই এখন মানুষ সহজে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছে। এতে চিঠি লেখার প্রয়োজনীয়তা কমে গেলেও এর আবেগময় দিকটি নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা রয়ে গেছে। সেই আনন্দের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

চিঠি উৎসবের পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে ডাকটিকিট প্রদর্শনী। সেখানে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের ইতিহাস, ডাকবিভাগের চিঠি প্রকাশের ইতিহাস এবং সংগৃহীত চিঠির ঐতিহাসিক নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনী ঘুরে শিক্ষার্থীরা ডাকটিকিট ও চিঠির ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।

আয়োজন সম্পর্কে রাজশাহীর পোস্টমাস্টার জেনারেল বলেন, এ ছাড়া ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের ইতিহাস জানার সুযোগ রয়েছে। এখানে ডাকবিভাগের চিঠি প্রকাশের ইতিহাস ও সংগৃহীত চিঠির ঐতিহাসিক নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রদর্শনী ঘুরে ডাকটিকিট ও চিঠির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন।

বর্তমানে চিঠির ব্যবহার কমে এলেও মানুষের অনুভূতি প্রকাশের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি উৎসব নব্বই দশকে চিঠি লেখার সেই অনুভূতিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। কাগজ-কলমে লেখা চিঠিতে শিক্ষার্থীরা খুঁজছেন পুরোনো দিনের স্মৃতি। হয়তো চিঠি পৌঁছাতে ডিজিটাল বার্তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে, কিন্তু চিঠির প্রতিটি শব্দে থেকে যাবে লেখকের আন্তরিকতা আর ভালোবাসার ছাপ। চিঠি উৎসবটি যেন হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ারই মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
জবিতে যাকাত ও কল্যাণ তহবিলের বৃত্তি পেলেন ৫৬ শিক্ষার্থী
আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) পরিবারের যাকাত ও কল্যাণ তহবিলের উদ্যোগে ৫৬ শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে। নবমবারের মতো আয়োজিত এ বৃত্তি কার্যক্রমে বিভিন্ন বিভাগের নানা ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার জন্য নির্বাচিত করা হয়।
জবিতে যাকাত ও কল্যাণ তহবিলের বৃত্তি পেলেন ৫৬ শিক্ষার্থী
অবরুদ্ধ চুয়েট উপাচার্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে উপাচার্য ভবনে অবরুদ্ধ রয়েছেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর ১২টা থেকে তিনি ভবনটির ভেতরে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অবরুদ্ধ চুয়েট উপাচার্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
রুয়েটে আবারও ১২ শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ১২ শিক্ষার্থীকে আগামী দুই শিক্ষাবর্ষের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে, সেই পরীক্ষাগুলো ঐ শিক্ষার্থীদের জন্য বাতিল করা হয়েছে।
রুয়েটে আবারও ১২ শিক্ষার্থী বহিষ্কার
প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থীর কবি নজরুল কলেজে নেই একটিও ডাস্টবিন
রাজধানীর প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবি নজরুল সরকারি কলেজে প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। অথচ পুরো ক্যাম্পাসে নেই বর্জ্য ফেলার কোনো নির্ধারিত স্থান বা ডাস্টবিন।
প্রায় ২১ হাজার শিক্ষার্থীর কবি নজরুল কলেজে নেই একটিও ডাস্টবিন
চুয়েটে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে খাবার দিলেন আন্দোলনকারীরা
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) প্রশাসনিক ভবন-২ এ প্রায় ২৪ ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ রয়েছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমসহ ১১ জন।  মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য সকালের নাস্তা পৌঁছে দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দেওয়া আলটিমেটামের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও উপাচার্য ভবন না ছাড়ায় গতকাল সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ভবনের ভেতরের ফটকে তালা লাগিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা।  একই সঙ্গে ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এ সময় তারা ‘তালা, তালা, তালা হবে, ভিসি ভবন তালা হবে’ এবং ‘প্রত্যাখ্যান, প্রত্যাখ্যান, অনলাইন ভিসি প্রত্যাখ্যান’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ বিষয়ে পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইজাজ মাহমুদ খাঁন বলেন, নবনিযুক্ত উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকবেন। গতকাল তাকে বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার পরও তিনি স্বেচ্ছায় অবরুদ্ধ থেকেছেন। আমরা অবরুদ্ধ সবাইকে সকালের খাবার পৌঁছে দিয়েছি। এর আগে, গতকাল সোমবার সকালে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। পরে দুপুর ১২টার দিকে তাকে ভবন ছেড়ে যাওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন না ছাড়ায় তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখেন তাঁরা। আরটিভি/এসআর
চুয়েটে অবরুদ্ধ উপাচার্যকে খাবার দিলেন আন্দোলনকারীরা
আরও পড়ুন
নওগাঁয় ব্যতিক্রমী ‘চিঠি উৎসব’: কাগজের ভাঁজে আবেগের রঙিন প্রকাশ
বিরল আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেলেন রাবির প্রফেসর ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. অরুন কুমার 
পা হারিয়েও দমেননি, রাবির সাবেক শিক্ষার্থী সুজন এখন স্টেশনমাস্টার
রাবিতে হামলা: চোখে কালো কাপড় বেঁধে ইবি সাংবাদিকদের প্রতিবাদ