
ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে মুখোশধারী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন ইউরোপের একদল কূটনীতিক। এ ঘটনায় বেলজিয়ামের কনসাল জেনারেলসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো। হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীও ঘটনাটিকে গুরুতর সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করে তদন্তের কথা জানিয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর বলছে, ঘটনার পুরো চিত্র স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাহর কাছে খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত তাইবেহ গ্রামে যান বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পোল্যান্ড ও ক্যাথলিক গির্জার প্রতিনিধিদের একটি দল। ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে প্রায় প্রতিদিন বসতি স্থাপনকারীদের হামলার অভিযোগ ওঠায় পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে সেখানে গিয়েছিলেন তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ পরা কয়েকজন বসতি স্থাপনকারী কূটনীতিকদের গাড়িবহরের সামনে বাধা দেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময় পাথর ছোড়ার ঘটনাও ঘটে।
বেলজিয়ামের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটির কনস্যুলেটের একটি গাড়ির জানালা ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া ফ্রান্সের এক মেয়র হামলার শিকার হয়েছেন। ভিডিওতে ফরাসি পতাকার রঙের ফিতা পরা এক ব্যক্তিকে গাড়ির পাশে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
হামলার শিকার ফ্রান্সের উত্তরের অউলনোয়া-আইমেরি শহরের মেয়র বার্নার্ড বোদু বলেছেন, বসতি স্থাপনকারীরা তাকে লাথি মেরেছেন এবং লোহার রড দিয়ে আঘাত করেছেন। একপর্যায়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপিকে দেওয়া বক্তব্যে মেয়র বলেন, বিনা কারণে এমন সহিংসতার ঘটনা তাকে হতবাক করেছে। হামলাকারীরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ অবস্থায় সেখানে এসেছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বোদুর ভাষ্য, পশ্চিম তীরে কী ঘটছে, তা পুরো বিশ্বের জানা প্রয়োজন। তিনি নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন, কিন্তু সেখানে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদেরই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
বেলজিয়ামের কড়া বার্তা
বেলজিয়ামের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, হামলার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দায়িত্ব ইসরায়েলের।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন এমন সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন। জলপাই সংগ্রহ, সংবাদ সংগ্রহ কিংবা কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কারও হামলার শিকার হওয়া উচিত নয়।
প্রেভো আরও বলেন, দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা দেওয়া এবং কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের দায়মুক্তির অবসান হওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ ঘটনায় দায়ীদের পাশাপাশি তাদের সমর্থনকারীদের বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবিতে বেলজিয়াম কাজ চালিয়ে যাবে বলে জানান তিনি।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিন্দা, তবে প্রশ্নও
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা'আর হামলার নিন্দা জানিয়ে ঘটনাটিকে ইসরায়েলি দাঙ্গাকারীদের সহিংসতা বলে উল্লেখ করেছেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে তার মন্ত্রণালয় যোগাযোগ রাখছে বলেও জানান তিনি।
তবে তিনি বলেন, ঘটনাটি গুরুতর হলেও সফরের আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় না করাটা দুঃখজনক। তার মতে, আগে থেকে সমন্বয় করা হলে সফরকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হতে পারত।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাইবেহ এলাকায় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ওপর হামলার ঘটনায় তারা কঠোরভাবে নিন্দা জানাচ্ছে। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, হামলার সময় ঘটনাস্থলে তাদের কোনো সেনাসদস্য উপস্থিত ছিলেন না।
তদন্তের আগে সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান নেতানিয়াহুর দপ্তরের
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দপ্তরের বক্তব্য, ভিডিওতে ঘটনার পুরো ধারাবাহিকতা বা ব্যক্তিগতভাবে কার দায় রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না। ঘটনার প্রকৃত তথ্য ও দায়ীদের শনাক্ত করতে ইসরায়েলি পুলিশ এবং অপরাধতদন্ত বিশেষজ্ঞরা তদন্ত শুরু করেছেন।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরের ইহুদি বাসিন্দাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে সমন্বিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে উদ্বেগ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশের আগেই চাঞ্চল্যকর শিরোনাম দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।
আগের দিনও হামলার শিকার মার্কিন সাংবাদিক
ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর হামলার মাত্র এক দিন আগেই পশ্চিম তীরের অন্য একটি গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি ও মার্কিন সংবাদপত্রের আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন আহত হন।
ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। হামলার দৃশ্যকে তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও এ হামলার নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের দাবি জানান।
একই এলাকায় জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের ওপর হামলার অভিযোগ নতুন করে পশ্চিম তীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ


