
১০ মাসেরও বেশি সময় সমুদ্রে কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সান দিয়েগো উপসাগরে ফিরেছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রণতরিটি বন্দরে পৌঁছালে হাজারো নাবিককে স্বাগত জানান তাদের স্বজনেরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কেউ জড়িয়ে ধরেছেন প্রিয়জনকে, কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। আবার অনেক বাবা প্রথমবারের মতো কোলে নিয়েছেন সমুদ্রে থাকাকালে জন্ম নেওয়া সন্তানকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পরিচালিত সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া এই রণতরির নাবিকেরা টানা ২৬৫ দিন সমুদ্রে কাটানোর রেকর্ড গড়েছেন। পুরো মোতায়েনের সময় ছিল ৩২২ দিন। দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পাশাপাশি খাবার ও অন্যান্য সরবরাহের ঘাটতি এবং নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
২০ বছর বয়সী নাবিক আবেল রামিরেজের জন্য এটি ছিল জীবনের প্রথম সামরিক মোতায়েন। রণতরি থেকে নেমে তিনি বলেন, অবশেষে ফিরে আসতে পেরে তার দারুণ লাগছে। একপর্যায়ে তিনি আর কখনো জাহাজ থেকে নামতে পারবেন না বলেও মনে করেছিলেন। তাকে স্বাগত জানাতে টেক্সাস থেকে এসেছিলেন তার মা-বাবা।
১৪ বছর বয়সী ক্যাসিটি গার্দুক তার মাকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। জাহাজ ভেড়ানোর পর ওপরের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানায় সে। ক্যাসিটি জানায়, তার সপ্তম শ্রেণির পড়াশোনার বেশির ভাগ সময় এবং জন্মদিনে মা পাশে থাকতে পারেননি। এবার মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবে ভেবে সে খুশি।
রণতরির অধিনায়ক ক্যাপ্টেন ড্যানিয়েল কিলার জানান, নাবিকদের অধিকাংশেরই এটি ছিল প্রথমবারের মতো দীর্ঘ সময়ের সামরিক মোতায়েন। তার মতে, এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকলে নানা সমস্যা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, জাহাজটি ভাসমান একটি শহরের মতো, যেখানে যেকোনো সময় টয়লেটের মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাতেও সমস্যা হতে পারে। তার দাবি, নাবিকেরা প্রতিদিন চারবার খাবার পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
দীর্ঘ মোতায়েনের সময় জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী প্রথমদিকে সমস্যার গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছিল। গত আগস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, লিংকনের মোতায়েনের সময়কাল তার কাছে যথেষ্ট দীর্ঘ বলে মনে হয়নি। পরে নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা জাহাজে কিছু সমস্যার কথা স্বীকার করেন।
বুধবার রণতরিতে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নাবিকদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল ইউনিট সাইটেশন তুলে দেন। এটি কোনো সামরিক ইউনিটের জন্য সর্বোচ্চ সম্মাননার একটি। হেগসেথ বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, ধৈর্য ধরে দায়িত্ব পালন এবং অভিযান শেষ করার মধ্যেই মার্কিন সামরিক বাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যদের সক্ষমতা প্রকাশ পায়। একই সঙ্গে তিনি লিংকনকে অকার্যকরতা, মনোবলহীনতা কিংবা ব্যর্থ অভিযানের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন।
দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরেছেন এমন অনেক নাবিক, যারা সমুদ্রে থাকাকালে বাবা হয়েছেন। নৌবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় জাহাজ থেকে নামা নাবিকদের মধ্যে ৬৪ জন বাবা তাঁদের সন্তানদের প্রথমবার দেখেছেন। রণতরির সঙ্গে থাকা বিমানবাহিনীর সদস্যদের হিসাব যুক্ত করলে নতুন বাবা হয়েছেন মোট ১২২ জন।
ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ভার্জিনিয়া বিচের বাসিন্দা ক্যাথি মনতেরোসা তার ছয় মাস বয়সী মেয়ে সারাহিকে নিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় ছিলেন। ছোট্ট নাবিকের পোশাক পরানো মেয়েটিকে দেখিয়ে তিনি বলেন, এই সন্তান তাদের দীর্ঘ মোতায়েনের সময় জন্ম নেওয়া শিশু। গর্ভাবস্থায় জাহাজের কঠিন পরিস্থিতির খবর শুনে তিনি অনেক কেঁদেছেন এবং স্বামী ঠিক আছেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এখন পরিবারের সবাইকে ফিরে পেয়ে তিনি স্বস্তি বোধ করছেন।
নাবিক স্টিভেন রিভাসও সাত মাস বয়সী মেয়েকে কোলে নিয়ে আনন্দে ভাসছিলেন। বন্দরে ফেরার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার ভাষায়, উপসাগরে ঢোকার সময় সবাইকে দেখতে পাওয়া এবং পরিবার তার জন্য অপেক্ষা করছে—এই অনুভূতি বাস্তবে উপলব্ধি করাই কঠিন ছিল।
আরেক নাবিকের স্ত্রী আলমা সোলানো ভেলেজ জানান, তার স্বামী গত ১০ মাসে যেসব খাবার খেতে চেয়েছেন, সেগুলোর একটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেছেন। তালিকায় রয়েছে গরুর লেজের মাংস, বারবিকিউ মুরগি, ব্রকলি ও চিংড়ির পুর দেওয়া খাবার। জাহাজে খাবার ও গোসলের সংকটের কথাও স্বামী তাকে জানিয়েছিলেন। স্বামী দূরে থাকাকালে তাদের মেয়ের বয়স চার বছর হয়েছে।
রণতরিটি গত বছরের নভেম্বরে সান দিয়েগো ছেড়ে যায় এবং জানুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। যুদ্ধ চলাকালে সামরিক অভিযান ও নিরাপত্তাজনিত কারণে জাহাজে প্রয়োজনীয় সরবরাহ পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। গত আগস্টে নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাও জানান, খাবারের পর্যাপ্ত মজুত ছিল; তবে অল্প সময়ের জন্য খাবারের ধরন ও বিকল্প কমে গিয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরার পথে গত মাসের শুরুতে রণতরিটি থাইল্যান্ডে বিরতি নেয়। দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে থাকা নাবিকদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং জাহাজ ও সরঞ্জামের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। নৌবাহিনী আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে, এই রেকর্ড গড়া মোতায়েনের সময় আটজন নাবিক আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ১০ মাসে ছয় হাজার নাবিকের একটি সামরিক বহরের হিসাবে এই সংখ্যা তুলনামূলক কম।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ নাবিকদের সামনে যে সম্মাননাপত্রের বিবরণ পড়ে শোনান, তাতে বলা হয়, লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা সামরিক বহর প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সময় ৪৫০টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, একমুখী হামলায় ব্যবহৃত ৭৭টি চালকবিহীন উড়োজাহাজ ভূপাতিত, ইরানের ৬৪টি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া এবং জাহাজবিধ্বংসী ২১টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের কথা উল্লেখ করা হয়।
এর আগে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড মে মাসে ৩২৬ দিনের মোতায়েন শেষে দেশে ফেরে। গত ৫০ বছরে কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরির এটিই ছিল দীর্ঘতম মোতায়েন। অন্যদিকে, এশিয়াভিত্তিক মার্কিন রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন গত আগস্টে মধ্যপ্রাচ্যে লিংকনের দায়িত্ব নেয়।
সূত্র: এপি
আরটিভি/জেএমএ


