
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ল্যানসিং শহরের একটি জনপ্রিয় হাঁটার পথে একের পর এক পাঁচজন পুরুষের মৃত্যু ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। তাদের সবাই ওই পথের আশপাশে আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিলেন। এসব ঘটনার পেছনে কোনো ধারাবাহিক খুনি জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন গৃহহীন ছিলেন এবং রাতে নদীর পাশের ওই পথে ঘুমাতেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ল্যানসিং নদীপথের একই অংশে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। শহরটির পুলিশপ্রধান রবার্ট ব্যাকাসের ধারণা, ঘটনাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। বিশেষ করে গৃহহীন শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
পুলিশপ্রধান সাংবাদিকদের বলেন, তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ল্যানসিংয়ে কোনো ধারাবাহিক খুনি সক্রিয় কি না। ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
শহরের মেয়র অ্যান্ডি শোর অবশ্য সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এসব হামলার লক্ষ্য ছিলেন মূলত রাতে নদীপথের পাশে ঘুমানো গৃহহীন পুরুষেরা। সাধারণ জনগণকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের জন্য নদীপথ এবং শহরের কেন্দ্রীয় এলাকা নিরাপদ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন মেয়র।
নিহতদের একজন ৫৪ বছর বয়সী জিনো চৌইনার্ড। তার চাচা রবার্ট চৌইনার্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে কয়েক মিনিট দেরি হওয়ায় একটি গৃহহীন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেননি জিনো। পরে তিনি তার বান্ধবীকে ফোন করে জানান, নদীপথের পাশে ঘুমাবেন।
পরদিন, ১৪ অক্টোবর (২০২৫ সালের) সকালে জিনোকে মাথায় গুরুতর আঘাতসহ অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ১৩ দিন পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। একসময় তিনি উচ্চবিদ্যালয়ে কুস্তি ও ফুটবলে দক্ষ খেলোয়াড় ছিলেন। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ইরাকে জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের পর বিভিন্ন সময়ে তিনি গৃহহীন হয়ে পড়েন বলে জানান তার চাচা।
রবার্টের দাবি, জিনোর মাথার খুলি চূর্ণ হয়েছিল এবং তার ছয়টি পাঁজর ভেঙে গিয়েছিল। শরীরে আত্মরক্ষার চিহ্ন বা ধস্তাধস্তির লক্ষণ ছিল না বলেও জানান তিনি। তার ধারণা, ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় পেছন থেকে আঘাত করা হয়েছিল জিনোকে।
একই পথে আরও চারজনের মৃত্যু
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ঘটনায় ৭০ বছর বয়সী ডেনিস ডানব্যাকেকে গত ৯ জুলাই কালামাজু স্ট্রিট সেতুর কাছে মুখে আঘাতসহ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন পর তার মৃত্যু হয়। তবে তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি চিকিৎসা পরীক্ষকের কার্যালয়। হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসাকর্মী ঘটনাটি অসুস্থতাজনিত হতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন। পুলিশ অবশ্য বিষয়টিকে সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচনা করে।
এরপর ১৩ জুলাই সকালে ৫৭ বছর বয়সী রবার্ট স্মিথকে একই পথে মাথায় রক্তাক্ত আঘাতসহ অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। হাসপাতালে নেওয়ার কয়েক দিন পর তার মৃত্যু হয়। গত মাসে চিকিৎসা পরীক্ষক তার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেন।
তৃতীয় আরেক ঘটনায় ২২ বছর বয়সী ড্যানিয়েল লাস্ককে ২০ আগস্ট ভোরে ছুরিকাঘাতে নিহত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ ঘটনায় একজন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এখনো জামিন ছাড়াই আটক রয়েছেন এবং তার মানসিক সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তদন্তাধীন অন্য মৃত্যুর ঘটনাগুলোর সঙ্গে তার যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
পঞ্চম ব্যক্তি ৫৭ বছর বয়সী লুইস উডরাফ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট তাকে মুখে আঘাতসহ উদ্ধার করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুকেও হত্যাকাণ্ড হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বাড়িয়েছে পুলিশ
পুলিশপ্রধান ব্যাকাসের ধারণা, এসব ঘটনায় ভুক্তভোগীদের ওপর হামলা রাতের বেলায় হয়েছে। তাদের অনেকে তখন শুয়ে ছিলেন, এমনকি ঘুমিয়েও থাকতে পারেন। ঘটনার সময় ওই এলাকায় কোনো নজরদারি ক্যামেরা বা প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি।
এরপর নদীপথে নজরদারির জন্য ক্যামেরাযুক্ত গাড়ি বসানো হয়েছে, টহল বাড়ানো হয়েছে এবং এলাকার গৃহহীন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন সমাজকর্মীরা।
পুলিশপ্রধান বলেন, এসব ঘটনা পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে এবং বিষয়টি উপেক্ষা করা হচ্ছে—এমন ধারণা কারও হওয়া উচিত নয়।
এদিকে, জিনোর চাচা রবার্ট মনে করেন, এসব মৃত্যুর পেছনে ধারাবাহিক কোনো খুনি অথবা একই কায়দায় হামলা চালানো অনুকরণকারী থাকতে পারে। তবে পুলিশ এখনো কোনো ধারাবাহিক খুনির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেনি। তদন্তকারীরা সব সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখছেন।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/জেএমএ


