
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে যেসব নির্বাচনী কর্মকর্তা মার্কিন নাগরিক নন (অমার্কিন নাগরিক - noncitizen) এমন ভোটার হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ভোট গণনা করবেন, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্ত ও মামলা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির আইনবিষয়ক কার্যালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে এ সতর্কবার্তা দেন। চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা শার্লি ওয়েবার এবং লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচন নিবন্ধকের কাছেও।
চিঠিতে বিচার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধান ট্রেন্ট ম্যাককটারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়া ফেডারেল আইন অনুযায়ী অপরাধ। কেউ জেনেশুনে এ ধরনের ভোট গণনা করলে বা অপরাধে সহায়তা করলে তিনিও আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
এর এক দিন আগে ক্যালিফোর্নিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করে ট্রাম্প প্রশাসন। কেন্দ্রীয় সরকারের শনাক্ত করা যেসব ভোটারকে ‘সম্ভবত অমার্কিন নাগরিক’ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট গণনা বন্ধ রাখার দাবি জানানো হয়েছে মামলায়।
চিঠির বিষয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচন নিবন্ধক ডিন লোগান বলেন, তার কার্যালয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচন আয়োজনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। নির্বাচনের দিন আর মাত্র ১৮ দিন বাকি উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ যাচাই না করা দাবিগুলো নিয়ে আদালতে গেছে। তাই বিষয়টি আদালতেই নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অন্য সংশ্লিষ্ট কার্যালয় ও অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পও শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিঠিটি নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ শেয়ার করে হুঁশিয়ারি দেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাগারে যেতে হবে। তবে কতজন নির্বাচনী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত বা মামলা করা হতে পারে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
চলতি বছর অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কাছে ভোটারদের জন্মতারিখ, ঠিকানা, চালকের লাইসেন্স নম্বর এবং সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের আংশিক তথ্যও চেয়েছে বিচার বিভাগ।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত নির্বাচনে অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগে প্রায় ৯০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিচার বিভাগ। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে অমার্কিন নাগরিক হয়েও ভোট দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে অমার্কিন নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে বিভিন্ন গবেষণা ও তদন্তে উঠে এসেছে।
গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী মার্কওয়েইন মুলিন ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, নিউ জার্সি ও পেনসিলভানিয়াকে চিঠি দিয়ে দাবি করেছিলেন, এসব অঙ্গরাজ্যে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ অমার্কিন নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত থাকতে পারেন। সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তারা এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
একই মাসে নেভাদায় ভোটার তালিকায় দেড় হাজার অমার্কিন নাগরিক থাকার দাবি করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তালিকা দেওয়ার পর অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ে একজন নিবন্ধিত অমার্কিন ভোটারও পাওয়া যায়নি।
ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য ফৌজদারি মামলার হুঁশিয়ারিকে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টির পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কয়েকজন আইন বিশেষজ্ঞ।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক রিক হাসেন বলেন, চিঠির মাধ্যমে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তার মতে, নির্বাচন পরিচালনায় অঙ্গরাজ্যগুলোকে সহযোগিতা করার বদলে কেন্দ্রীয় সরকার এমন সময়ে হুমকি ও অতিরিক্ত দাবি জানাচ্ছে, যখন নির্বাচনপ্রক্রিয়া চলমান।
অন্যদিকে, লয়োলা আইন বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিচার বিভাগের সাবেক উপসহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জাস্টিন লেভিট বলেন, চিঠিতে দেওয়া যুক্তির ভিত্তিতে কোনো নির্বাচনী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলে তা আদালতে টিকবে বলে তিনি মনে করেন না। তার ভাষ্য, দেশজুড়ে নির্বাচনী কর্মকর্তারা এ ধরনের চাপ মোকাবিলায় প্রস্তুত এবং আইন তাদের পক্ষে রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি ভোটার নিবন্ধিত রয়েছেন। অঙ্গরাজ্যটির কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিনিধি পরিষদীয় আসনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে কোন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে, নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ না করার দীর্ঘদিনের নীতি মেনে চলতে বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট দলের আইনপ্রণেতারা। শুক্রবার সিনেটর অ্যালেক্স পাডিলা, শেলডন হোয়াইটহাউস ও ডিক ডারবিন অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চকে চিঠি দিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার আগে ব্যালট বা নির্বাচনী সরঞ্জাম জব্দ না করার নিশ্চয়তা চেয়েছেন।
সূত্র: এপি
আরটিভি/জেএমএ


