
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নিজের বাসা ভেবে ভুল করে প্রতিবেশীর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দণ্ডিত সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অ্যাম্বার গাইগার প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন। ১০ বছরের কারাদণ্ডের মধ্যে সাত বছর কারাভোগের পর শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। বাকি সাজা তাকে কারাগারের বাইরে থেকে শর্তসাপেক্ষে ভোগ করতে হবে।
২০১৮ সালে ২৬ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ যুবক বোথাম জিনকে হত্যার দায়ে ২০১৯ সালের অক্টোবরে গাইগারকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তখন তার বয়স ছিল ৩১ বছর। বর্তমানে ৩৮ বছর বয়সী গাইগার টেক্সাসের গেটসভিলের ক্রিস্টিনা মেলটন ক্রেইন কারাগার থেকে মুক্তি পান।
বোথাম জিনের পরিবারের আইনজীবী লি মেরিট জানান, গাইগারের আগাম মুক্তিতে পরিবার অসন্তুষ্ট। তবে তাদের ক্ষোভের বড় কারণ ছিল হত্যার দায়ে তাকে মাত্র ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তিনি যেন পুরো সাজা ভোগ করেন।
মেরিট বলেন, গাইগারের পুরো সাজা ভোগের পক্ষে তারা ছিলেন। তবে আগাম মুক্তি ঠেকানো যাবে—এমন নিশ্চয়তা তাদের ছিল না। তার মতে, পরিবারের হতাশা মূলত সাজা ঘোষণার সময় থেকেই শুরু হয়েছিল।
গাইগারের আইনজীবী রবার্ট এল রজার্স এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারেননি। তবে চলতি মাসে ডালাসের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে তিনি জানান, মুক্তির পর গাইগারের থাকার জায়গা ও কাজের ব্যবস্থা রয়েছে। কারাগারে থাকাকালে তিনি অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন বলেও দাবি করেন ওই আইনজীবী।
২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে নিজের বসার ঘরে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন এবং আইসক্রিম খাচ্ছিলেন বোথাম জিন। অভিযোগপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় তার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে পড়েন গাইগার।
জিনের অ্যাপার্টমেন্টটি ছিল গাইগারের নিজের বাসার ঠিক এক তলা ওপরে। ঘটনার সময় ডালাস পুলিশের চার বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা গাইগার ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় থাকলেও তিনি কর্মরত ছিলেন না।
গাইগার আদালতে জানান, ভুল তলায় গাড়ি রাখার কারণে তিনি নিজের বাসা মনে করে জিনের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে পড়েন। তার দাবি, চাবি দিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করলে দরজাটি খুলে যায়। ভেতরে জিনকে দেখে তাকে চোর মনে হয়েছিল এবং নিজের জীবন রক্ষার ভয়ে গুলি চালান তিনি।
গুলি লেগে জিন নিহত হন। এ ঘটনায় গাইগারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডটি যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্য, পুলিশের আচরণ এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দেয়। গাইগার শ্বেতাঙ্গ এবং জিন ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ।
বিচার চলাকালে গাইগার ক্ষমা চান। তখন জিনের কিশোর ভাই ব্র্যান্ডট জিন তাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা জানান।
টেক্সাসের ক্ষমা ও প্যারোল বোর্ড গত ১ অক্টোবর গাইগারের প্যারোল অনুমোদন করে। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তার প্যারোলের আবেদন নাকচ হয়েছিল।
বোর্ডের বিবৃতিতে বলা হয়, কারাগারে গাইগারের আচরণ সন্তোষজনক ছিল। মুক্তির পর পূর্ণকালীন ও স্থায়ী চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে সহায়ক বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে সহিংসতা বা হামলার ধারাবাহিক গ্রেপ্তার কিংবা দণ্ডের নথি না থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালে গাইগারের মুক্তির বিরোধিতা করেছিল ডালাস কাউন্টির অ্যাটর্নি কার্যালয়। এবার এ বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করেনি। ডালাস পুলিশ বিভাগও নতুন করে মন্তব্য না করে আগের বিবৃতির কথা উল্লেখ করেছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, গাইগারের মুক্তির সিদ্ধান্ত বোথাম জিনের মর্মান্তিক মৃত্যুর স্মৃতি ও সংশ্লিষ্ট আবেগ নতুন করে সামনে আনতে পারে। জিনের পরিবার ও তার মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি সহমর্মিতাও জানিয়েছিল পুলিশ বিভাগ।
অন্যদিকে, পরিবারের আইনজীবী মেরিট মনে করেন, গাইগার এখনো সমাজের জন্য ঝুঁকি হতে পারেন। তার যুক্তি, গাইগার আদালতে নিজের পুলিশি প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে তাঁর কর্মকাণ্ডকে ন্যায্য বলে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এমন মানসিকতা উদ্বেগের কারণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গাইগারের মুক্তির খবর প্রকাশের পর বোথাম জিন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তার পরিবার ব্যক্তিগত পরিসর ও গোপনীয়তা বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।
ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ার বাসিন্দা বোথাম জিন ডালাসে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। ২০২১ সালে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল, যেখানে ডালাস পুলিশের সদর দপ্তরও রয়েছে, সেই সড়কের নাম পরিবর্তন করে ‘বোথাম জিন বুলেভার্ড’ রাখা হয়।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


