
অবসরে টেলিভিশন দেখা অনেকেরই পছন্দের কাজ। তবে দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় ধরে টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা মস্তিষ্কের জন্য ভালো নাও হতে পারে। নতুন এক গবেষণায় এমনই ইঙ্গিত মিলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সে যারা তুলনামূলক বেশি টেলিভিশন দেখার কথা জানিয়েছেন, দুই দশকেরও বেশি সময় পর তাদের মস্তিষ্কের কিছু অংশের আয়তন তুলনামূলক ছোট ছিল। এসব অংশ ভাষা, চিন্তাভাবনা ও মানসিক কার্যক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই গবেষণা থেকে টেলিভিশন দেখাই মস্তিষ্কের পরিবর্তনের সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এটি কেবল দীর্ঘ সময় টেলিভিশন দেখা ও মস্তিষ্কের কিছু পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে।
গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের চারটি এলাকায় পরিচালিত এআরআইসি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। এই গবেষণার কেন্দ্রগুলো ছিল—
মূল গবেষণায় ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের তথ্য নেওয়া হয়।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলেছে গবেষণা
জাতীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণার তথ্য ব্যবহার করে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষের জীবনযাত্রা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণার শুরুতে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ৪৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে।
তাদের কত ঘন ঘন টেলিভিশন দেখেন এবং কর্মক্ষেত্রে কত সময় বসে থাকেন, সে বিষয়ে তথ্য নেওয়া হয়। দুই দশকেরও বেশি সময় পর তাদের মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় চিত্র পরীক্ষা করা হয়।
যারা খুব ঘন ঘন টেলিভিশন দেখতেন, তাদের মস্তিষ্কের ভাষা ও চিন্তাভাবনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি অংশের আয়তন তুলনামূলক কম দেখা গেছে। তাদের মস্তিষ্কে ছোট রক্তনালির ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরিবর্তনও বেশি ছিল।
শুধু বসে থাকা নয়, কাজের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় বসে থাকলেও একই ধরনের সম্পর্ক দেখা যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেলিভিশন দেখা তুলনামূলকভাবে নিষ্ক্রিয় কাজ। এ সময় দর্শক মূলত তথ্য গ্রহণ করেন। অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রে বসে থাকলেও ইলেকট্রনিক চিঠির উত্তর দেওয়া, বিভিন্ন কাজ করা বা সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার মতো কাজে মস্তিষ্কের নানা অংশ সক্রিয় থাকে।
অর্থাৎ, সব ধরনের বসে থাকা বা পর্দার সামনে কাটানো সময় এক রকম নয়।
নিয়মিত শরীরচর্চা করলেই কি ঝুঁকি থাকবে না?
গবেষণায় শারীরিক পরিশ্রমের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তারপরও বেশি টেলিভিশন দেখার সঙ্গে মস্তিষ্কের কিছু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এর অর্থ, নিয়মিত শরীরচর্চা অবশ্যই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয়ভাবে টেলিভিশন দেখা পুরোপুরি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব কি না, সে বিষয়ে এই গবেষণা নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।
তবে কি টেলিভিশন দেখা বন্ধ করতে হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তা নয়। পছন্দের অনুষ্ঠান দেখা, খেলা উপভোগ করা বা পরিবারের সঙ্গে বসে কোনো অনুষ্ঠান দেখা বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগের অংশ হতে পারে।
তবে দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিষ্ক্রিয়ভাবে টেলিভিশন দেখা বা মুঠোফোনে উদ্দেশ্যহীনভাবে নানা বিষয় দেখতে থাকলে তা অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় কেড়ে নিতে পারে। যেমন শরীরচর্চা, বই পড়া, মানুষের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো বা মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে এমন কাজ।
মস্তিষ্ক ভালো রাখতে যা করবেন
মস্তিষ্কের সুস্থতায় নিয়মিত শরীরচর্চা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা, ডায়াবিটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা করা, ধূমপান এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত মদ্যপান না করা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও জরুরি।
ফল, শাকসবজি, শস্য, ডাল, বাদাম, মাছ ও স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে শ্রবণশক্তি বা মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার চিকিৎসা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটিমাত্র অভ্যাস নয়—দীর্ঘ সময় ধরে দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা সিদ্ধান্তই মস্তিষ্কের সুস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/জেএমএ


