
আইফোন কিনে দেওয়ার দাবি নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে তর্ক। এরপর এক তরুণের চরম সিদ্ধান্ত এবং তাকে বাঁচাতে গিয়ে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু—ভারতের মহারাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এই ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে অনেককে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, সন্তানের সব চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই কি বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে?
বর্তমানে অনেক কর্মজীবী বাবা-মা ব্যস্ততার কারণে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে সেই সময়ের অভাব পূরণ করতে সন্তান যা চায়, তা কিনে দেওয়ার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই সব চাহিদা পূরণ হতে থাকলে সন্তান ধীরে ধীরে ‘যা চাই, তা-ই পাব’—এমন মানসিকতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মনোরোগ চিকিৎসকদের মতে, কোনো চাহিদা পূরণ না হলে অতিরিক্ত রাগ, জেদ, ভাঙচুর, নিজেকে আঘাত করার হুমকি বা বিপজ্জনক আচরণের মতো বিষয়গুলোকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এর পেছনে আবেগ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা বা অন্য মানসিক জটিলতাও থাকতে পারে। তবে এমন আচরণ দেখলেই কোনো নির্দিষ্ট রোগ আছে বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সব চাহিদা পূরণ করাই সমাধান নয়
সন্তান দামি কোনো জিনিস চাইলে সেটি সঙ্গে সঙ্গে কিনে দেওয়ার পরিবর্তে তাকে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য বোঝানো প্রয়োজন। কোন চাহিদা প্রয়োজনীয় আর কোনটি শুধু ইচ্ছা—সেই পার্থক্যও ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাবা-মাকে প্রয়োজন হলে সন্তানকে ‘না’ বলতে শিখতে হবে। তবে সেই ‘না’ যেন শুধু রাগ বা শাসনের মাধ্যমে না হয়। কেন কোনো কিছু এখন দেওয়া সম্ভব নয় বা কেন সেটি প্রয়োজনীয় নয়, তা শান্তভাবে বুঝিয়ে বলা জরুরি।
সন্তান জেদ করলে কী করবেন?
সন্তান কোনো কিছু না পেয়ে কান্নাকাটি বা জেদ করলে সঙ্গে সঙ্গে বকাবকি না করে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করা যেতে পারে। তার মন অন্যদিকে নেওয়া, গল্প করা, বই পড়া, ছবি আঁকা বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত রাখাও সহায়ক হতে পারে।
শাসন প্রয়োজন হলেও অপমানজনক কথা বা খারাপ ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়। সন্তানকে বুঝিয়ে বলতে হবে, তার কোন আচরণটি ভুল এবং কেন ভুল। শুধু ভয় দেখিয়ে নয়, বন্ধুর মতো কথা বলেও অনেক সময় শিশুকে বোঝানো সম্ভব।
সময় দেওয়ার বিকল্প নেই
সন্তানকে শুধু দামি জিনিস কিনে দেওয়ার চেয়ে তার কথা শোনা এবং তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু বা কিশোর নিজের কষ্ট, হতাশা কিংবা ভয় পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে না। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে তারা মানসিকভাবে আরও একা হয়ে যেতে পারে।
বাবা-মা ব্যস্ত থাকলেও সন্তানের জীবনে এমন কোনো বিশ্বস্ত বড় মানুষের উপস্থিতি থাকা দরকার, যার সঙ্গে সে নিজের কথা বলতে পারে। শিক্ষক, প্রশিক্ষক বা কাছের কোনো আত্মীয়ও সেই ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রযুক্তির বাইরে আনুন সন্তানকে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু-কিশোরদের শুধু মুঠোফোন বা প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে খেলাধুলা, বই পড়া, গান, নাচ, নাটক বা অন্য সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেওয়া উচিত। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং বাস্তব জীবনে বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশাও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সন্তানকে ছোট থেকেই বোঝাতে হবে—জীবনে সব ইচ্ছা পূরণ হবে না, ব্যর্থতাও জীবনের অংশ। কোনো কিছু না পাওয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
সন্তানের আচরণে যদি বারবার নিজেকে আঘাত করার কথা বলা, আত্মহত্যার হুমকি দেওয়া, চরম হতাশা, অস্বাভাবিক রাগ বা বিপজ্জনক আচরণ দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া জরুরি।
আরটিভি/জেএমএ


