
সন্তান জন্মের পর বদলে যায় জীবনের অনেক হিসাব। বাড়ে দায়িত্ব, তৈরি হয় নতুন স্বপ্ন। তবে ছেলে না মেয়ে— সন্তানের লিঙ্গের সঙ্গে বাবার আয়ুর কোনো সম্পর্ক আছে কি? বিশেষ করে, কন্যাসন্তান হলে বাবার আয়ু বাড়ে— এমন ধারণার পেছনে কতটা বৈজ্ঞানিক সত্য রয়েছে?
গবেষণায় এ বিষয়ে মিলেছে মিশ্র ফল। কিছু গবেষণায় কন্যাসন্তানের সঙ্গে বাবার দীর্ঘায়ুর ইতিবাচক সম্পর্ক দেখা গেলেও, অন্য গবেষণায় এমন সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০০৬ সালে আমেরিকান জার্নাল অব হিউম্যান বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় পোল্যান্ডের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মানুষের সন্তানসংখ্যা ও আয়ুর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রতিটি কন্যাসন্তানের জন্মের সঙ্গে বাবার গড় আয়ু ৭৪ সপ্তাহ বেশি হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। তবে ছেলেসন্তানের সংখ্যার সঙ্গে বাবার আয়ুর উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
একই গবেষণায় ছেলে ও মেয়ে— উভয় ধরনের সন্তানের সংখ্যার সঙ্গে মায়ের আয়ু তুলনামূলক কম হওয়ার সম্পর্ক দেখা যায়। তবে এগুলো পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার ফল। তাই কন্যাসন্তান জন্মের কারণেই বাবার আয়ু বাড়ে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
২০১৭ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত নরওয়ের একটি বৃহৎ গবেষণায় ৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি মা এবং ৬ লাখ ৯১ হাজারের বেশি বাবার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সন্তানের লিঙ্গের সঙ্গে বাবার সামগ্রিক মৃত্যুঝুঁকি কিংবা হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুঝুঁকির উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ২০১২ সালে চীন ও তাইওয়ানের প্রবীণদের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও সন্তান ছেলে না মেয়ে—তার ভিত্তিতে বাবা-মায়ের মৃত্যুঝুঁকি ধারাবাহিকভাবে কমার প্রমাণ মেলেনি। যদিও কিছু বিশ্লেষণে কন্যাসন্তানের সম্ভাব্য সুবিধার ইঙ্গিত ছিল।
সন্তানের লিঙ্গের পাশাপাশি বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, মানসিক সমর্থন ও নিয়মিত যোগাযোগও বার্ধক্যে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০১৬ সালে চীনের প্রবীণদের নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় কন্যাসন্তানের কাছ থেকে পাওয়া আবেগগত যত্নের সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতা বজায় থাকা এবং মৃত্যুঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক দেখা যায়। তবে এই ফল নির্দিষ্ট সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটের; বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা সরাসরি প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে জিনগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ধূমপান, রোগের নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও সামাজিক সমর্থন মানসিক সুস্থতা এবং জীবনযাপনের মান উন্নত করতে পারে। তবে এসব সুবিধা শুধু কন্যাসন্তানের কাছ থেকেই আসে, এমন নয়।
‘মেয়ে সন্তান হলে বাবার আয়ু বাড়ে’—এমন ধারণার পেছনে একটি গবেষণার ইতিবাচক ফল থাকলেও অন্য গবেষণায় তা সমর্থিত হয়নি। তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য বলার সুযোগ নেই। কন্যাসন্তানের জন্ম বাবার আয়ু নির্দিষ্টসংখ্যক সপ্তাহ বা বছর বাড়িয়ে দেবে—এমন নিশ্চয়তাও বিজ্ঞান দেয় না।
দীর্ঘ জীবনের জন্য সুস্থ জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পরিবারের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের লিঙ্গ যা-ই হোক, ভালোবাসা, যত্ন ও পারস্পরিক সমর্থন জীবনের মান উন্নত করতে পারে।
আরটিভি/এমএইচজে




