
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) যাত্রা শুরু করেছে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ঢাকার আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে ইনস্টিটিউটটির উদ্বোধন করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের ইয়ুননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশে এটি চতুর্থ কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রথম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে চাইনিজ ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন ফাউন্ডেশনের অনুমোদন পাওয়ার পর একই বছরের নভেম্বরে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ কনফারেন্স’-এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইয়ুননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউটটির কার্যক্রম শুরু হলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চীনের সিপিসি ইয়ুননান প্রাদেশিক কমিটির স্থায়ী কমিটির সদস্য চাও চুনমিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান।
অনুষ্ঠানে চবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এটি একটি স্মরণীয় মাইলফলক। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একাডেমিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটকে শুধু ভাষা শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে না দেখে দুই দেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারাকে যুক্ত করার একটি শক্তিশালী সেতু হিসেবে উল্লেখ করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ইনস্টিটিউটটির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য চীনা ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং দেশটির আধুনিক উন্নয়ন সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হবে।
অধ্যাপক আল্-ফোরকান আরও বলেন, মানসম্পন্ন ভাষা শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ের সুযোগ তরুণ প্রজন্মের একাডেমিক গতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক গবেষণার ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করবে। একই সঙ্গে পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এ উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
ইয়ুননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি কমিটির সম্পাদক রুয়ান ছাওছি বলেন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও দক্ষ শিক্ষক পাঠানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি তরুণদের চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে সহযোগিতা করবে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়। কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট দুই দেশের তরুণদের চীনা ভাষা শেখার পাশাপাশি পারস্পরিক বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়া বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধান অতিথি চাও চুনমিন বলেন, ইয়ুননান প্রদেশ কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে দুই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের বৈশিষ্ট্য ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে ইনস্টিটিউটটিকে আরও সমৃদ্ধভাবে গড়ে তুলতে সহায়তা করা হবে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিল্পায়ন এবং বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে শিক্ষা, অর্থনীতি ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ-আল-মামুন আশা প্রকাশ করে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট নতুন উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেশের অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্যও দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-আমীন, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সফিকুল ইসলাম, ইয়ুননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি কমিটির সম্পাদক রুয়ান ছাওছি, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন, চবি ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট, চীনা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পরে অতিথিরা সম্মিলিতভাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের নামফলক উন্মোচন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে ছিল দুই দেশের সংস্কৃতির নানা পরিবেশনা। ইয়ুননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী সিংহনৃত্য এবং চীনা মার্শাল আর্ট ‘দ্য উশু স্পিরিট অব চায়না’ দর্শকদের আকর্ষণ করে। অন্যদিকে বিকেএসপির পরিবেশনায় ছিল ‘দ্য রিদমস অব বাংলাদেশ’। ইয়ুননান মিনজু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যয়নরত চীনা শিক্ষার্থীরাও বাংলা গান পরিবেশন করেন।
বাংলাদেশ ও চীনের শিল্পী-শিক্ষার্থীদের এসব পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক বন্ধুত্বের চিত্র ফুটে ওঠে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রথম কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এ প্রতিষ্ঠান চীনা ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে দুই দেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের মধ্যে যোগাযোগ এবং পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগও বাড়াবে প্রতিষ্ঠানটি।
আরটিভি/এসআর


