
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কাঁধে শাকসবজি ও ফলমূলের ঝুড়ি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারসংলগ্ন এলাকায় আসেন স্থানীয় কৃষকেরা। কেউ বড় বাজারে পণ্য নিয়ে গেলেও অনেকে নিজেরাই এখানে বসে বিক্রি করেন। মধ্যস্বত্বভোগী না থাকায় স্বাভাবিক বাজারের তুলনায় এসব পণ্য কম দামে পাওয়া যায় বলে জানান বিক্রেতারা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারসংলগ্ন এলাকায় স্বল্প পরিসরে প্রতিদিন বসে এই বাজার। এখানে পাওয়া যায় পাহাড়ি শাকসবজি, কলা, তেঁতুল, সফেদা, জামরুলসহ বিভিন্ন ধরনের ফল। তবে বাজারটির অন্যতম আকর্ষণ পাহাড়ি আনারস। চট্টগ্রামের পাহাড়ি আনারসের বেশ পরিচিতি থাকলেও এখানে একটি আনারস পাওয়া যায় ১৫ থেকে ২০ টাকায়, যা স্থানীয় বাজারের তুলনায় কম।

পাহাড়ে উৎপাদিত এসব শাকসবজি ও ফলমূলের বড় একটি অংশ কৃষকেরা নিজেরাই সকালে নিয়ে এসে বিক্রি করেন। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার সুযোগ থাকায় ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারেন। কৃষকদের দাবি, বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে বিক্রি না হওয়ায় এসব পণ্য সাধারণত সতেজ থাকে।
এ বাজারের প্রধান ক্রেতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত বাজারটি জমজমাট থাকে। ক্লাস শেষে হলে ফেরা শিক্ষার্থী কিংবা বাসায় ফেরার পথে শিক্ষক-কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় শাকসবজি ও ফলমূল কিনে নেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের আনাগোনা কমে গেলে বাজারও গুটিয়ে যায়।

শিক্ষকদের অনেকেই এই এলাকা থেকে বাসে ওঠেন। ফলে যাতায়াতের পথেই প্রয়োজনীয় বাজার করে নেওয়ার সুযোগ পান তারা। আবার শহীদ মিনার ছাত্রী হলসংলগ্ন হওয়ায় নারী শিক্ষার্থীদেরও এই বাজারে কেনাকাটা করতে দেখা যায়।

বাজারের অন্যতম পুরোনো বিক্রেতা বাশার। মধ্যবয়সী এই কৃষক জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি এখানে ব্যবসা করছেন। পাহাড়ে নিজের জমিতে উৎপাদিত শাকসবজি নিয়ে এসে বিক্রি করেন তিনি। ছুটির সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই তার প্রধান ক্রেতা। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী না থাকায় এখানকার পণ্যের দাম তুলনামূলক কম বলেও জানান তিনি।
মো. ইলিয়াস বিক্রি করছিলেন সফেদা, আম ও লেবু। তিনি জানান, ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই এলাকায় ব্যবসা করছেন। স্বল্প পরিসরে এখানে বসে ফল বিক্রি করেন। কিছু পণ্য বিক্রি না হলে পরে অন্য বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন তিনি।

পাহাড়ি কলা নিয়ে বসেছিলেন আবুল কালাম। তিনি জানান, নিজের গাছের কলা প্রতিদিন নিয়ে এসে বিক্রি করেন। বাজারের তুলনায় তার কলার দামও কম। দীর্ঘদিন ধরে এখানে কলা বিক্রি করায় অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সঙ্গে তার পরিচিতি ও সখ্য তৈরি হয়েছে।
শহীদ মিনারসংলগ্ন বাজার থেকে আনারস কিনছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিসা কারিমা। তিনি বলেন, আসলে এই বাজার থেকে কিছু কেনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে কেনা হয় না। ক্লাস শেষে যাওয়ার সময় চোখে যা পড়ে, ভালো লাগলে নিয়ে নিই। এখানকার শাকসবজি ও ফলমূল সতেজ ও টাটকা। সবার ক্ষেত্রেই হয়তো বিষয়টি এমন। কেননা ক্যাম্পাসের দুই নম্বর গেট ও বউবাজারে সপ্তাহে আলাদা চার দিন হাট বসে। সেখান থেকেও আমরা বাজার করি।

ক্যাম্পাসের ব্যস্ততার মধ্যেও পাহাড়ি কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বসা এই ছোট বাজারটি তাই শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তৈরি করেছে সরাসরি যোগাযোগের একটি সহজ পথ।
আরটিভি/জেএমএ




