
বাংলাদেশের মানুষের রান্নায় নিত্যদিনের সঙ্গী এবং অন্যতম অর্থকরী ফসল পেঁয়াজ। অথচ ফসল সংগ্রহের মৌসুমে পেঁয়াজের দাম কমে গেলে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না কৃষক। আবার ভালো দামের আশায় পেঁয়াজ মজুত রাখলেও উপযুক্ত সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে পচন, অঙ্কুর গজানো ও ওজন কমে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হয় তাদের। এই সংকট মোকাবিলায় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় পেঁয়াজ সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি ও পরীক্ষা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।
তাদের উদ্ভাবিত ব্যবস্থায় সংরক্ষণ কক্ষের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রায় ৫০০ কেজি পেঁয়াজ ধারণক্ষমতার এ প্রযুক্তি তৈরি ও স্থাপনে আনুমানিক ২৫ হাজার টাকা খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা যা ৭-৮ বছরের জন্য ব্যবহারযোগ্য হবে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ক্ষতি ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে বলে দাবি গবেষকের।
‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অব আ লো-কস্ট আইওটি-অ্যাসিস্টেড অনিয়ন স্টোরেজ সিস্টেম ফর রিডিউসিং পোস্টহারভেস্ট লসেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন বাকৃবির কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি জার্নাল অব ফুড প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী জানান, আমরা দেখতে পেয়েছি প্রায় ৮০ দিন পেঁয়াজ সংরক্ষণের পরীক্ষায় প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় নতুন ব্যবস্থায় মোট ওজন হ্রাস কমেছে মাত্র ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। একই সঙ্গে বাজারজাতযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ বেড়েছে ৬৮ দশমিক ২২ শতাংশ থেকে ৭৬ দশমিক ৮১ শতাংশে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ কেজি পেঁয়াজে পরীক্ষার হিসাবে প্রায় ৮ দশমিক ৫৯ কেজি বেশি পেঁয়াজ বাজারজাতযোগ্য ছিল। স্বয়ংক্রিয় এই প্রযুক্তিতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি গ্যাস সেন্সরের সাহায্যে পচনের সঙ্গে সম্পর্কিত গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রয়েছে। একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার পরিবেশের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্যান চালু বা বন্ধ করতে পারে। ফলে সংরক্ষণ কক্ষের ভেতরে বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
গবেষকের দাবি, গবেষণার পরীক্ষায় আইওটিনির্ভর ব্যবস্থায় তাপমাত্রা ১৮ দশমিক ৮১ থেকে ২৮ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৫৪ দশমিক ৩২ থেকে ৮২ দশমিক ৬০ শতাংশের মধ্যে ছিল। প্রচলিত কৃষক পর্যায়ের সংরক্ষণব্যবস্থার তুলনায় এতে পরিবেশের স্থিতিশীলতা বেশি পাওয়া গেছে। তবে এটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা নয়; বরং সেন্সরের তথ্যের ভিত্তিতে বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে সংরক্ষণপরিবেশ উন্নত করার প্রযুক্তি।
অধ্যাপক ড. মো. রোস্তম আলী আরও বলেন, পেঁয়াজ সংরক্ষণের সময় তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বায়ু চলাচলের পরিবর্তন নজরে রাখা জরুরি। এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে পেঁয়াজের ওজন কমে যায়, অঙ্কুর গজায় এবং পচন দেখা দেয়। তুলনামূলক কম খরচে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ ক্ষতি কমানোই তাদের গবেষণার উদ্দেশ্য। গবেষণায় ব্যবহৃত গ্যাস সেন্সরটি পচন শনাক্তকরণে গড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে বলে গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ফলাফল সংরক্ষণকক্ষের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও পেঁয়াজের অবস্থা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা তুলে ধরে।
কৃষকের এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপকৃত হতে পারেন এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষক বলেন, পেঁয়াজের দাম ও সংরক্ষণব্যবস্থার ওপর কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে। তবে পরীক্ষায় বাজারজাতযোগ্য পেঁয়াজের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে কৃষক সরাসরি লাভবান হতে পারে। প্রতি ৫০০ কেজি পেঁয়াজের ক্ষেত্রে পরীক্ষার দুই পদ্ধতির বাজারজাতযোগ্য ফলনের পার্থক্য ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। তাই নতুন ব্যবস্থায় প্রায় ৪৩ কেজি বেশি পেঁয়াজ বাজারজাতযোগ্য হতে পারে। যন্ত্রটি প্রয়োজনে ১০০০ কেজি পেঁয়াজ সংরক্ষণের যোগ্য করেও গড়ে তোলা সম্ভব।
মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি জানান, প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও উন্নত করা এবং বাস্তব সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে বড় পরিসরে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আমরা পেঁয়াজের পাশাপাশি আলু্ ও রসুন নিয়েও এর কার্যকারিতা যাচাই করছি। যন্ত্রটি পুরোপুরি সোলার প্যানেলে চালানো যায় এই ব্যবস্থা নিয়ে কাজ চলছে। ফলাফল সন্তোষজনক হলে কৃষক ও বাণিজ্যিক সংরক্ষণকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পাওয়া গেলে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের উপযোগী মডেল তৈরি করা সম্ভব।
আরটিভি/জেএমএ


