ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সৌদি বিমানবন্দরে হামলার আগে বাজেনি অ্যালার্ম, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৮ এএম
রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা; বিমানবন্দর এলার্মিং সিস্টেম। ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে একের পর এক প্রাণঘাতী হামলার আগে সাধারণ মানুষকে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। অথচ এর কয়েক দিন আগেও দেশটির আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা থেকে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে বার্তা দেওয়া হতো। গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে চার দফা হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, কেন নীরব ছিল সৌদি আরবের সতর্কতা ব্যবস্থা?

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার আগে সতর্কবার্তা বন্ধ রাখার কারণ সম্পর্কে সৌদি সরকার এখনো প্রকাশ্যে কিছু জানায়নি। তবে আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের কয়েকজন ও বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি বজায় রাখা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক এড়ানোর চেষ্টা এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। জরুরি পরিস্থিতিতে সতর্কবার্তা দেওয়া, উদ্ধারকাজ ও অগ্নিনির্বাপণের দায়িত্বও এ সংস্থার। গত মে মাসে দেশটি মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু করে।

কিন্তু ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কা বাড়তে থাকলেও গত সপ্তাহের প্রাণঘাতী হামলার আগে এ ব্যবস্থা থেকে কোনো সতর্কবার্তা আসেনি। সংস্থাটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল ২৯ সেপ্টেম্বর, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান প্রদেশের জন্য।

এরপর সোমবার (১২ অক্টোবর) আবারও সতর্কবার্তা জারি করা হয়। রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরে সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়। তবে বিমানবন্দরে হামলার পরই সতর্কবার্তা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সতর্কবার্তা বন্ধ রাখার কারণ জানতে চেয়েছিলেন দেশটির মিত্র একটি পশ্চিমা সরকারের কর্মকর্তারা। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি জানেন—এমন দুজন কর্মকর্তা জানান, তাঁদের বলা হয়েছিল, সতর্কবার্তার কারণে জনজীবনে বিঘ্ন ঘটছিল। রাতে সতর্কবার্তা পেয়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অনেক নাগরিক অভিযোগও করেছিলেন।

তবে এ বক্তব্যের বিষয়ে সৌদি সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেননি।

যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত সৌদি গবেষক সুলতান আলামের মতে, সৌদি সরকার একই সঙ্গে সামরিক অভিযান চালাতে এবং দেশের মানুষের পাশাপাশি বিদেশি অংশীজনদের আস্থা ধরে রাখতে চাইছে। তার ভাষায়, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করার চেষ্টা থেকেই সতর্কবার্তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি বলেন, হামলার বিষয়ে জনসাধারণকে কীভাবে জানানো হবে, তা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ এক ধরনের দ্বিধায় রয়েছে। হুতি বিদ্রোহীদের মোকাবিলা করতে গিয়ে তারা জনজীবনে অস্থিরতা তৈরি করতে চায় না। কিন্তু আগাম সতর্কবার্তা না থাকায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের হামলার মুখে পড়েছে। তবে এসব হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশগুলোর পদ্ধতি এক নয়।

কাতার প্রায় প্রতিটি হামলার আগে মুঠোফোনে সতর্কবার্তা দিয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ মানুষকে ঘরের ভেতরে থাকতে এবং জানালা থেকে দূরে থাকার নির্দেশও দিয়েছে। অন্যদিকে, বাহরাইন ও কুয়েত বারবার সাইরেন বাজিয়ে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সৌদি আরবে অবশ্য এ মাসে সোমবারের আগপর্যন্ত সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সামরিক সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই সময়ের মধ্যে রিয়াদ প্রায় এক ডজনবার হামলার শিকার হয়েছে।

সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক আলী শিহাবির মতে, আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও দেশটির সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করা কঠিন। বিশাল আয়তনের সৌদি আরবে বিমানবন্দর, জ্বালানি তেলের পাইপলাইন ও তেল স্থাপনার মতো অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে।

তার ভাষ্য, একই সময়ে সব স্থাপনা রক্ষার মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সৌদি আরবের হাতে নেই। ফলে দেশটির জন্য আকাশ প্রতিরক্ষার চাহিদা অনেক বেশি।

এই পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কবার্তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের মতো জনবহুল স্থানে হামলার আগে মানুষকে সতর্ক করা কতটা জরুরি, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

সাধারণ মানুষের জন্য সতর্কবার্তা বন্ধ থাকলেও সৌদি আরবে কর্মরত পশ্চিমা দেশগুলোর দূতাবাসগুলো নিজেদের কর্মীদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের হামলার বিষয়ে অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিল। এসব বার্তা তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা তথ্য এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করা হতো।

রয়টার্সের দেখা সতর্কবার্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে বিমানবন্দরে প্রথম দিকের দুটি হামলার সময় দূতাবাসের কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছিল। তবে শনিবারের (১০ অক্টোবর) সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলার আগে দূতাবাসগুলোও কোনো অভ্যন্তরীণ সতর্কবার্তা পায়নি। কেন সেদিন কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়নি, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

হামলার পরও সোমবার রিয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সম্মেলনের আয়োজন করে সৌদি আরব। তবে হামলার কারণে বড় কয়েকটি জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা সম্মেলনের কর্মসূচি থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন।

সম্মেলনে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান দেশটির নিরাপত্তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসের কথা বলেন। রিয়াদে আসা অতিথিদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তারা জানেন দেশটি নিরাপদ। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, সম্মেলন আয়োজনের অর্থ এই নয় যে ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে গেছে।

সৌদি আরবের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, একদিকে সামরিক হামলার মোকাবিলা করা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ও বিদেশি অতিথিদের নিরাপত্তা নিয়ে আস্থা বজায় রাখা। কিন্তু প্রাণঘাতী হামলার আগে সতর্কবার্তা না দেওয়ার কারণ স্পষ্ট না হওয়ায় দেশটির আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
এবার সৌদির দাম্মাম বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পর এবার দাম্মাম বিমানবন্দরের কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামা বন্ধ থাকলেও সৌদি আরবের অন্যান্য রুটে সীমিত পরিসরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
এবার সৌদির দাম্মাম বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ফের হামলা
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নতুন করে হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন।
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে ফের হামলা
তুরস্কে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ১১, আহত ২৭
তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলে পর্যটকবাহী বাসের সঙ্গে একটি টো ট্রাকের সংঘর্ষে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৭ জন। রোববার (১১ অক্টোবর) দেশটির মানিসা প্রদেশের আখিসার এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
তুরস্কে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ১১, আহত ২৭
যুদ্ধের নামে প্রকৃতি ধ্বংস, অপরাধীদের বিচারের দাবি ইরানের
যুদ্ধের কারণে পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
যুদ্ধের নামে প্রকৃতি ধ্বংস, অপরাধীদের বিচারের দাবি ইরানের
সৌদির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা, দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২
এছাড়া, আহত হয়েছেন আরও ৩০৯ জন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের সবাইকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
সৌদির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা, দুই বাংলাদেশিসহ নিহত ১২
আরও পড়ুন
ঢাকা থেকে সৌদিগামী ৬১ ফ্লাইট স্থগিত, ভোগান্তিতে ৮৩৮১ যাত্রী
সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকতে বলেছে দূতাবাস
সৌদিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য অতি জরুরি নির্দেশনা
ভিসা শেষের পথে থাকা প্রবাসীদের সুখবর দিলেন বিমানমন্ত্রী