
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনা ফুটবল প্রবেশ করতে যাচ্ছে নতুন এক যুগে। বুধবার (৭ অক্টোবর) বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ২০৮তম ও শেষ ম্যাচ।
দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা বিদায় নিয়েছেন দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোল ও ম্যাচ খেলার রেকর্ড নিয়ে।
মেসির বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার সামনে এখন বড় প্রশ্ন তার শূন্যতা পূরণ করবেন কে? বিশেষ করে ম্যারাডোনা ও মেসির মতো কিংবদন্তিদের গায়ে ওঠা ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সির উত্তরসূরি হবেন কোন ফুটবলার?
আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি শুধু একটি সংখ্যা নয়। দিয়েগো ম্যারাডোনা ও মেসির আগে-পরে হুয়ান রোমান রিকেলমে, পাবলো আইমার ও আরিয়েল ওর্তেগার মতো তারকারাও এই জার্সি পরেছেন। তবে মেসির মতো দীর্ঘ সময় ধরে দলের খেলার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারেননি কেউ।
মেসির উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে অন্যতম হুলিয়ান আলভারেজ। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মেসির অনুপস্থিতিতে নিয়মিত তার জায়গায় খেলেছেন আতলেতিকো মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। ব্রাজিলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৪-১ গোলের জয়েও গোল করেছিলেন তিনি।
আলভারেজের বড় শক্তি তার বহুমুখিতা। স্ট্রাইকার হিসেবে খেলার পাশাপাশি নিচে নেমে আক্রমণ তৈরি করা, দুই প্রান্তে বিচরণ এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ তৈরি করতে পারেন তিনি। তবে মেসির মতো স্বাভাবিক প্লে-মেকার নন আলভারেজ। তার মূল শক্তি গোলমুখী দৌড়, পজিশনিং ও আক্রমণের শেষ ধাপে কার্যকর হওয়া।

সৃজনশীলতা ও খেলার ধরন বিবেচনায় মেসির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি তুলনা করা হয় নিকো পাজকে। কোমোর ২২ বছর বয়সী এই বাঁ পায়ের অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনা দলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। জাতীয় দলের হয়ে ১৩ ম্যাচে করেছেন ৩ গোল।
চাপের মধ্যে বল ধরে রাখা, জায়গা তৈরি করা, সতীর্থদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি এবং দ্রুত আক্রমণ এগিয়ে নেওয়ার দক্ষতা পাজকে আলাদা করে তুলেছে। তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তার প্রশংসাও করেছেন মেসি। ফলে ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে পাজের।
আরেকটি আলোচিত নাম ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুয়োনো। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই জাতীয় দলে নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছেন এই আর্জেন্টাইন উইঙ্গার। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে খেলা, ড্রিবলিং, ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ এবং দূরপাল্লার শটে দক্ষতা সব মিলিয়ে তার খেলায় মেসির কিছু বৈশিষ্ট্যের ছাপ দেখা যায়।
এর বাইরে থিয়াগো আলমাদাও আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন। ২৫ বছর বয়সী এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার জাতীয় দলের হয়ে ইতোমধ্যে ২৫ ম্যাচ খেলেছেন। মাঝমাঠের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী দুই প্রান্তেও খেলতে পারেন তিনি। তবে ইউরোপীয় ফুটবলে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা না থাকায় ১০ নম্বর জার্সির দৌড়ে আপাতত তাকে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে না।
তবে মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত ১০ নম্বর জার্সি কে পরবেন, সেটি নয়। বরং মেসি একাই যে দায়িত্বগুলো সামলাতেন, সেগুলো কীভাবে একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া যায়, সেটিই হবে বড় প্রশ্ন।
এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও লাওতারো মার্তিনেজদের নিয়ে আর্জেন্টিনার বর্তমান দলটির ভিত্তি শক্ত। তাদের সঙ্গে নিকো পাজ, মাস্তান্তুয়োনো, আলভারেজ ও আলমাদাদের মতো নতুন প্রজন্মকে আরও বড় দায়িত্ব নিতে হবে।
মেসি ছিলেন একই সঙ্গে দলের সেরা প্লে-মেকার, গোলদাতা, সৃজনশীলতার মূল উৎস এবং কঠিন মুহূর্তে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার খেলোয়াড়। একজনের পক্ষে তার সব দায়িত্ব নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
তাই মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘নতুন মেসি’ খোঁজা নয়; বরং নতুন বাস্তবতায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল তৈরি করা। ১০ নম্বর জার্সি শেষ পর্যন্ত কার গায়ে উঠবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে মেসিকে হারানোর পরও আর্জেন্টিনা কতটা নিজেদের জয়ের ক্ষুধা, সৃজনশীলতা ও দলগত শক্তি ধরে রাখতে পারে সেটিই হবে তাদের আসল পরীক্ষা।
আরটিভি/এসকে


