
গবাদিপশুর রোগ হিসেবে পরিচিত শামন্ডা ভাইরাস (Shamonda virus) এবার প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে শনাক্ত হয়েছে। ফ্রান্সে গুরুতর অসুস্থ ও রোগপ্রতিরোধক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল এক ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসটির সংক্রমণ নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে প্রাণিস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে গবাদিপশুর অস্বাভাবিক রোগ ও প্রজননজনিত সমস্যা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগ শনাক্তকরণ, সতর্কতা এবং ওয়ান হেলথ (One Health) পদ্ধতিতে নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মেডিসিন বিভাগের প্রাণী কল্যাণ ও আচরণ ল্যাবরেটরির অধ্যাপক ড. এম. আরিফুল ইসলাম।
তার মতে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শামন্ডা ভাইরাস শনাক্তের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন না থাকলেও পর্যাপ্ত নজরদারি ছাড়া ভাইরাসটির অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ প্রথম মানবদেহে শামন্ডা ভাইরাসের সংক্রমণের বিষয়টি প্রকাশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তি লিওঁর হাসপাতালে গুরুতর রোগের চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার রোগপ্রতিরোধক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল ছিল।
একাধিক জৈবিক নমুনা পরীক্ষায় ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। ৭ অক্টোবর দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তার সংক্রমণের বিষয়ে অবহিত হয়। পরে রোগীটি মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ECDC) ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছে।
বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদের মেডিসিন বিভাগের প্রাণী কল্যাণ ও আচরণ ল্যাবরেটরির অধ্যাপক ড. এম. আরিফুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ব ফ্রান্সে সংক্রমিত কিউলিকয়েডিস (Culicoides) নামের ক্ষুদ্র রক্তচোষা মিজের (একধরনের ক্ষুদ্র পোঁকা বা মাছি বিশেষ) কামড়ে ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। তবে সংক্রমণের প্রকৃত উৎস এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত নয়। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
১৯৬৫ সালে নাইজেরিয়ায় গরু থেকে প্রথম ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল ও জাপানে প্রাণীর শরীরে এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে গবাদিপশুর মধ্যে প্রথমবারের মতো ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হয়। জুন থেকে প্রাণীর মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর জুলাইয়ের শেষ দিকে ভাইরাসটি শনাক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাণীর মধ্যে সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়।
ড. আরিফ আরও বলেন, ভাইরাসটি প্রধানত গরুকে আক্রান্ত করে। আক্রান্ত গবাদিপশুর জ্বর, ডায়রিয়া, অবসন্নতা, ক্ষুধামন্দা ও দুধ উৎপাদন কমে যেতে পারে। এ ছাড়া গর্ভপাত, মৃত বাছুর জন্ম এবং ভ্রূণের জন্মগত বিকৃতির ঘটনাও ঘটতে পারে। গরুর পাশাপাশি ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া ও অন্যান্য প্রাণীতেও ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে এসব লক্ষণ অন্য রোগের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। তাই শুধু উপসর্গ দেখে শামন্ডা ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগ নির্ণয়।
মানুষের শরীরে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হলেও এখনই ব্যাপক জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক আরিফুল ইসলাম বলেন, একটি মানব সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে একটি বিচ্ছিন্ন সংক্রমণের ভিত্তিতে একে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। মানুষের শরীরে ভাইরাসটি কী ধরনের রোগ সৃষ্টি করতে পারে, কতটা সংক্রমণক্ষম এবং কোন জনগোষ্ঠী বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে এসব বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত তথ্য নেই।
তবে বাংলাদেশে রোগটি প্রতিরোধে নজরদারির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ড. আরিফ বলেন, বাংলাদেশে গাভীর গর্ভপাত, মৃত বা বিকৃত বাছুর জন্ম, জ্বর-ডায়রিয়া কিংবা হঠাৎ দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনা দেখা দিলে প্রচলিত রোগের পাশাপাশি গবেষণার প্রয়োজনে Simbu serogroup-এর ভাইরাসের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে শুধুমাত্র এসব লক্ষণের ভিত্তিতে শামন্ডা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। খামারিদের গোয়ালঘর ও আশপাশের ভেজা, কাদাযুক্ত এবং জৈব পদার্থসমৃদ্ধ স্থান পরিষ্কার রাখতে হবে। পশুর ঘরে মিজের প্রবেশ ও সংস্পর্শ কমাতে উপযুক্ত জাল, পরিচ্ছন্ন আবাসন এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
গাভীর গর্ভপাত, মৃত বা বিকৃত বাছুর জন্ম, জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা হঠাৎ দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ার ঘটনা তারিখসহ নথিবদ্ধ করে দ্রুত প্রাণিচিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। খামারে কাজের সময় শরীর ঢাকা পোশাক ও উপযুক্ত রিপেলেন্ট (পোঁকা ও মাছি নিরোধক) ব্যবহার করে কামড়ানো মিজ থেকে সুরক্ষিত থাকতে হবে। একই সাথে অস্বাভাবিক রোগ বা প্রজননজনিত সমস্যার ক্ষেত্রে গুজবে কান না দিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও প্রাণিচিকিৎসককে জানাতে হবে।
আরটিভি/এসআর




