ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

‎চিঠি: থেমে যাওয়া এক স্মৃতির গল্প

‎সানজিদা জান্নাত পিংকি

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:২২ এএম
প্রতীকী ছবি

‎একটা চিঠি আসার অপেক্ষা কেমন ছিল, তা হয়ত আজকের প্রজন্মের অনেকেরই জানা নেই। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি, দরজার সামনে এসে থামা পায়ের শব্দ, হাতে ধরা একটি খাম আর খামের ওপর নিজের নামটি দেখে হঠাৎ চমকে ওঠা। খামটি খোলার আগেই কত প্রশ্ন, কত কৌতূহল! কে লিখেছে? কী লিখেছে? কত দিনের খবর জমে আছে সেই কয়েক পাতার কাগজে?

আজ সেই অপেক্ষা অনেকটাই অতীত। একটি বার্তা পাঠাতে এখন আর ডাকঘরে যেতে হয় না, খাম কিনতে হয় না, ঠিকানা লিখে ডাকটিকিট লাগাতে হয় না। কয়েকটি শব্দ লিখে ‘সেন্ড’ চাপলেই মুহূর্তে পৌঁছে যায় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। যোগাযোগের এই অভাবনীয় গতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর সঙ্গে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে চিঠির সেই ধীর, ব্যক্তিগত ও স্পর্শযোগ্য সৌন্দর্য।

চিঠির ইতিহাস অবশ্য এতটা আধুনিক নয়। মানুষের লিখিত যোগাযোগের ইতিহাস যত পুরোনো, চিঠির ইতিহাসও ততটাই দীর্ঘ। প্রাচীন মিসরে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো পরিচিত ডাক-সংক্রান্ত নথির তারিখ খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৫ সাল। তবে এরও আগে রাজা-বাদশাহ ও শাসকেরা দূতদের মাধ্যমে লিখিত বার্তা পাঠাতেন। প্রাচীন চীন, পারস্য, মিশর, গ্রিস ও রোমে বিভিন্ন ধরনের বার্তাবাহক ও যোগাযোগব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। দূরত্ব যত বেড়েছে, নির্ভরযোগ্যভাবে খবর পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজনও তত বেড়েছে।

প্রাচীনকালে চিঠি ছিল মূলত ক্ষমতা ও প্রশাসনের হাতিয়ার। রাজ্যের এক প্রান্তে থাকা শাসকের নির্দেশ অন্য প্রান্তে পৌঁছে দিতে হতো। যুদ্ধের খবর, কর আদায়ের নির্দেশ, বাণিজ্যিক তথ্য কিংবা কূটনৈতিক বার্তা সবকিছুর জন্য প্রয়োজন ছিল দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের। পারস্য সাম্রাজ্যে ঘোড়সওয়ার বার্তাবাহকদের জন্য নির্দিষ্ট বিরতিস্থল ছিল। ফলে একসময় চিঠি শুধু কাগজে লেখা কয়েকটি বাক্য থাকলো না, এর সাথে গড়ে উঠল একটি বিশাল যোগাযোগ অবকাঠামো।

‎সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই যোগাযোগব্যবস্থা রাজদরবারের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রবেশ করে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের বার্তা আদান-প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলে। পরে ব্যক্তিরাও ডাকব্যবস্থার সুযোগ পেতে শুরু করেন।

চিঠির ইতিহাসে বড় পরিবর্তন আসে উনিশ শতকে। ১৮৪০ সালে ব্রিটেনে রাওল্যান্ড হিলের ডাক সংস্কারের ফলে চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থায় আসে যুগান্তকারী পরিবর্তন। একই বছর চালু হয় ‘পেনি ব্ল্যাক’, বিশ্বের প্রথম আঠালো ডাকটিকিট। ডাকমাশুলের নিয়ম সহজ হওয়ায় চিঠি পাঠানো সাধারণ মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

এরপর আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ১৮৭৪ সালের ৯ অক্টোবর ২২টি দেশ বার্ন চুক্তির মাধ্যমে General Postal Union প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৭৮ সালে এর নাম হয় Universal Postal Union বা UPU। একসময় যে ডাকব্যবস্থা ছিল বিচ্ছিন্ন দেশগুলোর আলাদা আলাদা ব্যবস্থার সমষ্টি, তা ধীরে ধীরে পরিণত হয় একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে।

দক্ষিণ এশিয়াতেও ডাকব্যবস্থার বিস্তার চিঠিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলে। দূরের শহরে পড়তে যাওয়া সন্তান, অন্য জেলায় চাকরি করা বাবা, বিদেশে থাকা স্বজন কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈনিক সবাই চিঠির মাধ্যমে আপনজনের কাছে পৌঁছাতেন। অনেক পরিবারে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনটি হয়ে উঠত চিঠির অপেক্ষার দিন।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও চিঠি ও ডাকব্যবস্থার রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সময় যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের বাস্তবতায় মানুষের মধ্যে খবর পৌঁছানো, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং মুক্তাঞ্চলে ডাকসেবা চালু রাখা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ডাকব্যবস্থার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয় এবং ডাকব্যবস্থা নতুন রাষ্ট্রের যোগাযোগ অবকাঠামোর একটি অংশ হয়ে ওঠে।

চিঠি শুধু মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গেই জড়িত ছিল না। এটি ইতিহাস সংরক্ষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কোনো সরকারি প্রতিবেদনে হয়ত লেখা থাকে একটি যুদ্ধ হয়েছিল, কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বা একটি রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু সেই সময়ের একজন সাধারণ মানুষ কী অনুভব করেছিলেন, পরিবারকে কী বলতে চেয়েছিলেন, দূরে থাকা স্বজনের জন্য তাঁর উদ্বেগ কতটা ছিল— তার অনেকটাই জানা যায় ব্যক্তিগত চিঠি থেকে। ইতিহাসবিদদের কাছে তাই ব্যক্তিগত চিঠি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক উৎস। একটি চিঠির ভাষা, হাতের লেখা, কাগজ কিংবা খামও কখনো একটি সময়ের সামাজিক বাস্তবতার সূত্র হয়ে উঠতে পারে।

আর চিঠির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ব্যক্তিগত স্পর্শ। হাতে লেখা চিঠিতে শুধু শব্দ থাকে না, থাকে একজন মানুষের সময়। একটি বাক্য লিখে থেমে যাওয়া, ভুল হলে কেটে দেওয়া, কোনো জায়গায় কালি একটু বেশি ছড়িয়ে যাওয়া— সবকিছু মিলে চিঠিটি হয়ে ওঠে তার লেখকের নিজস্ব উপস্থিতি।

সেই জায়গাতেই এসে আজকের বাস্তবতা কিছুটা বিষণ্ন। চিঠি এখন আর মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নয়। ই-মেইল, এসএমএস, মেসেঞ্জার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চিঠির জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে। দ্রুততা এখন যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মূল্য। একটি চিঠি পৌঁছাতে যেখানে কয়েক দিন লাগত, একটি মেসেজ পৌঁছাতে সেখানে কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট।

ডাকব্যবস্থার পরিসংখ্যানও সেই পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। Universal Postal Union-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ডাক ট্র্যাফিকের মধ্যে আন্তর্জাতিক চিঠির অংশ (আন্তর্জাতিকীকরণ হার) নেমে এসেছে এমন পর্যায়ে, যা প্রায় ১৮৮৮ সালের মাত্রার কাছাকাছি। ১৯১৩ সালে এই হার ছিল সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশে— অর্থাৎ গত এক শতাব্দীর প্রায় পুরো অর্জনই মুছে গেছে। প্রতিবেদন প্রণয়নকারী অর্থনীতিবিদ হোসে অ্যানসনের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে তা UPU-র জন্যই অস্তিত্বসংকট তৈরি করতে পারে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক পার্সেল পরিবহনেও ২০১৯ সালের সর্বোচ্চ মাত্রা থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ পতন ঘটেছে। ডিজিটাল যোগাযোগের দ্রুত বিস্তার এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ।

পরিবর্তনটি শুধু পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের অভ্যাসেও। আগে চিঠি ছিল ব্যক্তিগত যোগাযোগের স্বাভাবিক মাধ্যম। এখন হাতে লেখা চিঠি অনেকের কাছে বিশেষ আয়োজন। ডাকঘরে গিয়ে চিঠি পাঠানোর চেয়ে ফোনে কথা বলা বা মেসেজ পাঠানো অনেক সহজ। ফলে চিঠি ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবন থেকে সরে গিয়ে স্মৃতি, শখ কিংবা বিশেষ উপলক্ষের অংশ হয়ে উঠছে।

তবু কি চিঠি বিলুপ্ত হয়ে যাবে? হয়ত প্রচলিত অর্থে চিঠির ব্যবহার আরও কমবে। কিন্তু চিঠির প্রয়োজন একেবারে শেষ হয়ে যাবে কি না, তা বলা কঠিন। কারণ মানুষের অনুভূতি প্রযুক্তির গতির সঙ্গে বদলায় না। কাউকে ধন্যবাদ জানানো, ক্ষমা চাওয়া, বন্ধুকে নিজের মনের কথা বলা কিংবা দূরে থাকা প্রিয় মানুষকে মনে পড়ার কথা জানানো। এসবের জন্য আজও মানুষ কখনো কখনো একটু ধীর হতে চায়।

ডিজিটাল বার্তা আমাদের দ্রুত পৌঁছে দেয়, চিঠি আমাদের থামতে শেখায়। মেসেজ আমাদের খবর দেয়, চিঠি কখনো কখনো একটি স্মৃতি তৈরি করে। একটি পুরোনো চিঠি বহু বছর পরও খোলা যায়। তার কাগজ ছুঁয়ে একজন মানুষ ফিরে যেতে পারেন একটি নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট কোনো মানুষের কাছে। একটি পুরোনো মেসেজ হয়ত একইভাবে অনুভূতি জাগাতে পারে, কিন্তু হাতে লেখা চিঠির বস্তুগত অস্তিত্ব তাকে আলাদা করে তোলে।

চিঠির বিলুপ্তির গল্প তাই কেবল একটি যোগাযোগমাধ্যম হারিয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি আমাদের জীবন থেকে ধীরতার একটি অংশ হারিয়ে যাওয়ার গল্পও। প্রযুক্তি আমাদের অপেক্ষা কমিয়েছে, দূরত্ব কমিয়েছে, যোগাযোগকে সহজ করেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে কমিয়েছে চিঠি লেখার জন্য বসে থাকার সময়, উত্তর আসার অপেক্ষা এবং কাগজে কারও হাতের লেখা দেখার আনন্দ।

আরও পড়ুন

হয়ত একদিন চিঠি দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সত্যিই প্রায় হারিয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তার জায়গা থেকে যাবে। পুরোনো কোনো আলমারি খুলে পাওয়া একটি হলদে খাম তখনও হয়ত বলে উঠবে–একসময় মানুষ কথা বলত একটু ধীরে, অপেক্ষা করত একটু বেশি, আর কয়েক পাতার কাগজে রেখে যেত নিজের অনেকটা জীবন।

চিঠি শেষ পর্যন্ত শুধু কাগজ ও কালির ব্যাপারই না। চিঠি হলো সময় দেওয়ার গল্প। অপেক্ষার গল্প। স্মৃতির গল্প। আর সবচেয়ে বেশি একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষের কাছে পৌঁছানোর গল্প। চিঠি হয়ত হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষ যে একজন আরেকজনের কাছে পৌঁছাতে চায়, এই সত্যটি হারিয়ে যায়নি। আর যতদিন সেই চাওয়াটি থাকবে, ততদিন কোনো না কোনোভাবে চিঠিও বেঁচে থাকবে।

লেখক: সাবেক সভাপতি, গণ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি এবং শিক্ষানবিশ আইনজীবী

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ।
প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
আরও পড়ুন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পাঠানো শুভেচ্ছা চিঠিটি পরম যত্নে রেখেছেন ছাইফুল্লাহ 
আসিফ ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য চায় দুদক, বিএফআইইউকে চিঠি
গবিতে প্রথমবার ‘চিঠি দিবস’ উদযাপিত 
হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সেই চিঠির দিনে