
বড় অঙ্কের অর্থ জমা বা সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের বিনিময়ে বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার নতুন কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে আর্জেন্টিনা। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরাও দেশটিতে বসবাস না করেই দ্বিতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে কর্মসূচিতে আবেদন গ্রহণ এখনো শুরু হয়নি।
গত ২ অক্টোবর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের সরকার ‘বিনিয়োগের বিনিময়ে নাগরিকত্ব’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ঋণের চাপে থাকা দেশটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত কর্মসূচিতে বিদেশি আবেদনকারীদের জন্য দুটি পথ রাখা হয়েছে। প্রথমত, আর্জেন্টিনার সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য নয়—এমন ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার জমা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশেষভাবে তৈরি সরকারি বন্ডে ৮ লাখ ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। এ বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ সাত বছর ধরে রাখতে হবে।
প্রধান আবেদনকারীর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকবে। এ ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রী কিংবা ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী যোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের প্রত্যেকের জন্য অতিরিক্ত ১ লাখ ডলার দিতে হবে। ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতিটি সন্তানের জন্য দিতে হবে ২৫ হাজার ডলার।
কবে শুরু হবে আবেদন?
কর্মসূচি ঘোষণার পরও এখনই আবেদন করা যাচ্ছে না। আর্জেন্টিনার অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ দিকে আবেদন গ্রহণ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
২০২৫ সালের ৫২৪ নম্বর সরকারি আদেশে আবেদন যাচাই ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমে কর্মসূচি পরিচালনাকারী সংস্থা আবেদনকারীর বিনিয়োগ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে কি না, তা যাচাই করবে। এরপর আর্থিক তথ্য ইউনিট, জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কাছ থেকে যাচাই করা হবে।
সবশেষে আবেদন অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের সুপারিশ অভিবাসন অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এই অধিদপ্তর।
আবেদনকারীর পরিচয়, অপরাধসংক্রান্ত ইতিহাস এবং অর্থের উৎস যাচাই করা হবে। পাশাপাশি অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত নিয়মও মানতে হবে।
বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি?
কর্মসূচির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। আবেদন করতে কী কী কাগজপত্র লাগবে, আবেদন যাচাইয়ে কত সময় লাগবে এবং বিনিয়োগ কীভাবে জমা দিতে হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি আর্জেন্টিনা সরকার।
সরকারি বন্ডের ক্ষেত্রেও সুদের হার, সাত বছর পর অর্থ ফেরত পাওয়ার নিয়ম এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অর্থ তুলে নেওয়া যাবে কি না, তা নিশ্চিত করা হয়নি। বিনিয়োগের শর্ত ভঙ্গ হলে নাগরিকত্বের ওপর কী প্রভাব পড়বে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
কী সুবিধা পাবেন আবেদনকারীরা?
এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নাগরিকত্ব পেলে আবেদনকারীরা আর্জেন্টিনায় অনির্দিষ্টকাল বসবাস ও কাজ করার অধিকার পাবেন। সাধারণ নিয়মে নাগরিকত্বের যোগ্যতা অর্জনের আগে বিদেশিদের দুই বছর বসবাস করতে হয়। তবে যোগ্য বিনিয়োগের প্রমাণ দেখাতে পারলে এই শর্ত ছাড়াই নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
দ্বিতীয় নাগরিকত্বের মাধ্যমে আবেদনকারী ও যোগ্য পরিবারের সদস্যরা আরেকটি দেশের নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বসবাস ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ পেতে পারেন।
তবে আর্জেন্টিনার নাগরিকত্ব পেলেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শেষ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, দেশটির নাগরিকদের সাধারণত বিশ্বের যেকোনো দেশে অর্জিত আয়ের ওপর করসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিদেশে থাকা ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্যও জানাতে হতে পারে।
পর্তুগাল ও ক্যারিবীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা
বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বা বসবাসের সুযোগ দেওয়া অন্য কর্মসূচিগুলোর তুলনায় আর্জেন্টিনার প্রস্তাবে কিছু পার্থক্য রয়েছে। পর্তুগালের বিনিয়োগভিত্তিক কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট খাতে অর্থ বিনিয়োগ করে অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায়। সেখানে নাগরিকত্ব পেতে পরবর্তী সময়ে আলাদা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
অন্যদিকে, ডমিনিকা, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, গ্রেনাডা এবং সেন্ট কিটস ও নেভিসের মতো কয়েকটি ক্যারিবীয় দেশ সরাসরি নাগরিকত্ব দেওয়ার কর্মসূচি পরিচালনা করে। এসব দেশে অনুদানভিত্তিক নাগরিকত্ব পেতে সাধারণত ২ লাখ থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার লাগে। তবে এর সঙ্গে যাচাই ও প্রক্রিয়াকরণ ফি যোগ হতে পারে।
সে তুলনায় আর্জেন্টিনার ৩ লাখ ৫০ হাজার ডলারের অনুদানভিত্তিক পথটি ব্যয়বহুল। তবে যারা শুধু আরেকটি পাসপোর্ট নয়, বরং বড় একটি দেশে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের সুযোগ চান, তাদের কাছে এ কর্মসূচি আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে আবেদন গ্রহণের ব্যবস্থা চালু এবং সরকারি বন্ডের পূর্ণ শর্ত প্রকাশ না করা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা আবেদন করতে পারবেন না। একই সঙ্গে বিনিয়োগের আর্থিক ঝুঁকিও পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
সূত্র: নিউজউইক
আরটিভি/জেএমএ



