সুস্থ থাকতে শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়াই যথেষ্ট নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনেও কিছু ভালো অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। পর্যাপ্ত ঘুম, পরিমিত খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত পানি পান এবং মানসিক চাপ কমানোর মতো অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মন ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের জীবনে নিচের অভ্যাসগুলো যোগ করা যেতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে ব্যক্তিভেদে ঘুমের প্রয়োজন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
সন্ধ্যার পর কম আলো
রাতে অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো ও মুঠোফোন বা অন্যান্য পর্দার আলো ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই ঘুমানোর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে মুঠোফোন, কম্পিউটার বা অন্য পর্দা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা ভালো।
বাদাম ও বীজ খান
বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজে প্রোটিন, আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে এসব খাবার খাওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়।
তৈলাক্ত মাছ রাখুন খাবারে
তৈলাক্ত মাছে ভালো মানের প্রোটিন ও ওমেগা-৩ ধরনের চর্বি থাকে। নিয়মিত মাছ খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কিছু সমস্যা এবং শরীরের প্রদাহজনিত কয়েকটি রোগের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
বেশি করে ফল ও সবজি
ফল ও সবজিতে আঁশ, ভিটামিন, খনিজ ও বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত ফল ও সবজি রাখলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকার পাওয়া যায়। বিভিন্ন গবেষণায় বেশি ফল ও সবজি খাওয়ার সঙ্গে দীর্ঘায়ু এবং হৃদ্রোগ ও স্থূলতার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
পর্যাপ্ত পানি পান
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন। পানি রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে। তাই তৃষ্ণা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত পানি পান করা উচিত।
প্রোটিনের ঘাটতি নয়
শরীরের কোষ ও বিভিন্ন টিস্যু তৈরি ও মেরামতের জন্য প্রোটিন প্রয়োজন। পর্যাপ্ত প্রোটিন খেলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি হতে পারে, ক্ষুধা ও অপ্রয়োজনীয় খাবারের প্রতি আগ্রহ কমতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন রাখা জরুরি।
জলপাইয়ের তেল বেছে নিন
জলপাইয়ের অতিরিক্ত পরিশোধন না করা তেলে স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। ২০২৫ সালের একটি পর্যালোচনায় এ ধরনের তেল খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্স্বাস্থ্যের বিভিন্ন উপকারের সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। তবে যেকোনো তেলের মতো এটিও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
মিষ্টি পানীয় এড়িয়ে চলুন
কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া ফলের পানীয় ও মিষ্টি চা-কফিতে বাড়তি চিনি থাকে। নিয়মিত এসব পানীয় খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর পরিবর্তে চিনি ছাড়া চা, কফি বা পানি পান করা যেতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান
প্যাকেটজাত বিস্কুট, চিপস, ফাস্টফুড, মিষ্টি খাবার ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত প্রস্তুত খাবারে অনেক সময় বাড়তি চিনি, পরিশোধিত তেল, লবণ ও বিভিন্ন সংযোজক থাকে। এসব খাবারে প্রয়োজনীয় আঁশ ও পুষ্টি তুলনামূলক কম থাকতে পারে। অতিরিক্ত খাওয়ার সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
বাড়তি চিনি কম খান
চিনি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও খাবার ও পানীয়তে অতিরিক্ত চিনি যোগ করার অভ্যাস কমানো ভালো। বেশি চিনি খাওয়ার সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক রয়েছে।
পরিশোধিত শর্করা কমান
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত শর্করাযুক্ত খাবারে আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান কমে যেতে পারে। এসব খাবার বেশি খেলে সহজেই অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ হতে পারে। তাই খাবারে পরিশোধিত শর্করার বদলে তুলনামূলক কম প্রক্রিয়াজাত ও আঁশযুক্ত খাবার রাখা ভালো।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
নিয়মিত শরীরচর্চা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট করার পরামর্শ দেওয়া হয়। হাঁটা, সাইকেল চালানো বা পছন্দের অন্য কোনো শারীরিক কাজও এর মধ্যে থাকতে পারে।
শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করুন
শুধু হাঁটা বা দৌড়ানোর মতো ব্যায়াম নয়, পেশির শক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহে অন্তত দুই দিন এ ধরনের ব্যায়াম করলে পেশির শক্তি, শরীরের গঠন এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত হতে পারে। নিজের শরীরের ওজন বা ব্যায়ামের রাবার ব্যবহার করেও এ ধরনের ব্যায়াম করা যায়।
ভিটামিন ডি নিশ্চিত করুন
হাড় ও পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে ভিটামিন ডির ঘাটতি আছে কি না, প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পরিবার ও বন্ধুদের সময় দিন
পরিবার, বন্ধু ও কাছের মানুষের সঙ্গে সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভালো সামাজিক সম্পর্ক মানসিক চাপ কমাতে এবং সামগ্রিকভাবে সুস্থ থাকতে সাহায্য করতে পারে। তাই ব্যস্ততার মধ্যেও কাছের মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো জরুরি।
মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান করুন
নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। প্রতিদিন সকালে বা রাতে কয়েক মিনিট নীরবে বসে মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাস করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত উদ্বেগ বা মানসিক সমস্যায় প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য সব অভ্যাস একসঙ্গে বদলানোর প্রয়োজন নেই। ধীরে ধীরে খাবার, ঘুম, শরীরচর্চা ও দৈনন্দিন রুটিনে ভালো পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলেই তা দীর্ঘমেয়াদে অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
সূত্র: হেলথলাইন
আরটিভি/জেএমএ


