
‘দাদি, হেঁটে যাচ্ছেন কেন? ট্রেনে উঠে আসেন।’ ট্রেনের যাত্রীর এমন প্রশ্নের জবাবে বৃদ্ধার উত্তর, ‘না, আজ ট্রেনে যাব না। আমার একটু তাড়া আছে, তাড়াতাড়ি যেতে হবে।’
চিলমারী অঞ্চলের এই প্রচলিত রসিকতাটি আজ আর কেবল কোনো গল্পে সীমাবদ্ধ নেই, বরং কুড়িগ্রামের চিলমারী রেলপথের দৈনন্দিন বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ধীরগতির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে এই ট্রেন নিয়ে নানা হাস্যরসের সৃষ্টি হলেও, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে জরাজীর্ণ এক রেলপথের করুণ চিত্র। জরাজীর্ণ লাইনের কারণে ট্রেনের গতি এতই কমে গেছে যে, চলন্ত ট্রেন থেকেই প্রতিনিয়ত মানুষ নামছেন ও উঠছেন।
পার্বতীপুর-রংপুর-কাউনিয়া হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী রমনা বাজার পর্যন্ত চলাচলকারী এই ট্রেনটিতে প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে উলিপুর থেকে রমনা বাজার পর্যন্ত অংশের রেললাইনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ স্লিপার এবং নড়বড়ে অবকাঠামোর কারণে ঝুঁকি এড়াতে বাধ্য হয়েই ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে ঘণ্টা মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা যায়, ধীরগতির সুযোগ নিয়ে অনেকেই অনায়াসে চলন্ত ট্রেনে উঠছেন ও নামছেন। তবে এ ঘটনা কেবল ভ্রমণের ধৈর্যের পরীক্ষাই বাড়ায়নি, তৈরি করেছে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতি কম থাকায় অনেকেই চলন্ত ট্রেনে ওঠানামাকে বিপজ্জনক মনে করছেন না। অনেকে আবার সামাজিক মাধ্যমে রিলস বা টিকটক ভিডিও বানিয়ে বিনোদন নেওয়ার উদ্দেশ্যে লাফিয়ে ওঠা-নামার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
রেললাইনের পাশের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ট্রেনের গতি কম দেখে অনেকে বিষয়টিকে সহজভাবে নিচ্ছেন। কিন্তু চলন্ত ট্রেনে ওঠানামা কখনোই নিরাপদ নয়। সামান্য অসাবধানতায় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে। এই ঝুঁকিপূর্ণ চর্চা বন্ধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জোব্বার আলী জানান, বড়দের দেখাদেখি ছোটরাও এখন চলন্ত ট্রেনে ওঠানামায় উৎসাহিত হচ্ছে। এর ফলে যা একসময় রসিকতা বা গল্পের অংশ ছিল, তা এখন বাস্তব ট্র্যাজেডিতে রূপ নেওয়ার আশংকা তৈরি করছে।
রেলপথের জরাজীর্ণ অবস্থার কথা স্বীকার করে রমনা বাজার স্টেশন কার্যালয়ের বুকিং সহকারী মো. নাজমুল হাসান জানান, উলিপুর থেকে রমনা বাজার পর্যন্ত রেললাইনে প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত নানা জটিলতা রয়েছে। যাত্রী ও ট্রেনের নিরাপত্তার স্বার্থেই ট্রেনের গতি কমিয়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটারে আনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে এবং ইতিমধ্যেই রেলপথ সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। উলিপুর অংশ পর্যন্ত কাজ দৃশ্যমান হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, দ্রুতই চিলমারী অংশের কাজও সম্পন্ন হবে। লাইন আধুনিকায়ন ও সংস্কারকাজ শেষ হলে ট্রেনের গতি ও সেবার মান স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বলে আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।
আরটিভি/এসএস


